অপরিপক্ব আম লিচু

আপডেট : ২৮ মে ২০২০, ২২:৪৬

মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বাজারে আসতে শুরু করেছে অপরিপক্ব  আম ও লিচু। প্রতিকূল আবহাওয়া আর ঝড় বৃষ্টির আশঙ্কায় পাকার আগে এমনকি পুরোপুরি লাল রং আসার আগেই লিচু বিক্রি করতে শুরু করেছেন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। কিছু লিচুতে রং ধরলেও পাকতে অন্তত এক সপ্তাহ লাগবে। অথচ অতিরিক্ত মুনাফার আশায় এসব কাঁচা লিচুই বিক্রি হচ্ছে রাজধানীসহ দেশের সকল হাটবাজারে। দিনাজপুর, নাটোর, ঈশ্বরদী, সোনারগাঁও, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাজি, বোম্বাই, কাঁঠালি, চায়না, চায়না থ্রি, আর বেদানা লিচু কেমিক্যালযুক্ত করে পাকানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে অপরিপক্ব আমেও কেমিক্যাল দিয়ে পাকিয়ে বাজারে তোলা হচ্ছে।

জানা গেছে, মৌসুমের শুরু থেকে পরিপক্ব ও কেমিক্যালমুক্ত লিচু বিক্রির জন্য চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বৈঠকের পর লিচু পাড়ার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না। নির্ধারিত ২১ মের আগে দিনাজপুর-নাটোর বা অন্য কোনো এলাকার লিচু পাড়ায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু অনেক চাষিই এই নিষেধাজ্ঞার  তোয়াক্কা করছেন না। রাজশাহীর আম পাড়া শুরু হবে ২১ মে থেকে। তার আগেই অনেকে অপরিপক্ব আম পেড়ে বাজারে তুলছেন। রাজধানীর বেশ কিছু বাজার এবং রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করে বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে অপরিপক্ব লিচু ও আম। কৃষি বিভাগ বলছে, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর বাজারে নজরদারি না থাকায় এই অবস্থা চলছে।

আমাদের সংবাদদাতারা জানান, লিচুর জন্য বিখ্যাত দিনাজপুরের বাগানগুলোতে এখন লিচু পরিপক্ব হতে শুরু করেছে। গাছে গাছে দুলছে মাদ্রাজি, বোম্বাই, কাঁঠালি, চায়না, চায়না থ্রি, আর বেদানা লিচু। মাদ্রাজি লিচু পরিপক্ব হয় ২৫ মের মধ্যে আর বোম্বে, বেদানা, চায়না থ্রি জুন মাসের ১০ তারিখের মধ্যে। কিন্তু যারা বাগান কিনে নিয়েছেন, সেইসব বাগান মালিক অপরিপক্ব অবস্থায় লিচু বাজারে নিয়ে আসছেন। বাজারে মাদ্রাজি লিচু প্রতিশ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। সব লিচু চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। 

কৃষকরা বলেন, লিচু পড়ে গেছে। বোঁটা পরিপক্ব হয়নি। এই জন্যেই এইভাবেই বাজারজাত করছি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্প্রে করে গায়ের রং লাল করে বাজারজাত করছে। ঝড়, শিলাবৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা এবং প্রখর রৌদ্রের কারণে লিচু আগাম পেরে বাজারে নিয়ে আসছেন বাগান মালিকরা। তারা বলছেন, আবহাওয়ার কারণে লিচু জ্বলে যাচ্ছে, ফেটে যাচ্ছে তার কারণে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। বাজারে অপরিপক্ব লিচু বিক্রির অভিযোগ করলেন ক্রেতারাও।  তারা বলেন, কিছুদিন পরে এই লিচু খেয়ে যে মজা পাবে মানুষ এখন তা হবে না। এটা তো পরিপক্ব লিচু নয়।

অপরিপক্ব লিচু ও আমবাজারে আনার কথা স্বীকার করে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার গুহ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে বাজার মনিটরিংয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। নাটোরের জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত কুমার সরকার জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৯১৩ হেক্টর বাগানে লিচু চাষ হয়েছে। এ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টন লিচু উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে জেলার লিচু ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, অপরিপক্ব এসব লিচু রাজশাহীর পুঠিয়া ও পাবনার ঈশ্বরদী থেকে এনে অল্প কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী বিক্রি করছেন। যারা প্রকৃত লিচু ব্যবসায়ী, তারা বাগান ইজারা নিয়ে রেখেছেন, যেখান থেকে প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার পরেই লিচু আহরণ করা হবে।

মৌসুমি লিচু ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, গুটি জাতের লিচু মৌসুমের শুরুতে বাজারে একটু আগেই আসে। তবে লিচু অপরিপক্ব নয়। গুরুদাসপুরের লিচু চাষি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, যদিও আমরা এবার লিচুর বিক্রি নিয়ে শঙ্কিত, তবুও তড়িঘড়ি করে বিক্রির পক্ষে নই। প্রশাসন নির্ধারিত তারিখেই আমরা লিচু পেরে বিক্রি শুরু করব।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. কাজী মিজানুর রহমান বলেন, যে কোনো ফল পরিপক্ব ও খাবার উপযোগী হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের পূর্বে তা গ্রহণ উচিত নয়। রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করে পাকানো যে কোনো মৌসুমি ফল পরিহার করা উচিত।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগে অপরিপক্ব লিচু বাজারে বিক্রির বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। রবিবার থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত জেলায় অপরিপক্ব লিচু বিক্রি রোধে অভিযান শুরু করেছে।