শেয়ারবাজারে করপোরেট সুশাসন জরুরি

আপডেট : ২৯ মে ২০২০, ২১:০৫

রকিবুর রহমান

 

গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এর যে মারাত্মক ভুল ছিল সেটা হলো কমিশন ইনডেক্স নিয়ন্ত্রণ করেছে। শেয়ার বেচা-কেনাতে হস্তক্ষেপ করেছে, শেয়ার ট্রেডিং এ হস্তক্ষেপ করেছে। যখন বাজারে শেয়ারের দাম কমে যায় এবং ট্রানজেকশন ভলিউম কমে যায় তখন চেষ্টা করেছে ট্রানজেকশন ভলিউম বাড়ানোর জন্য। আবার যখন শেয়ারের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যায় তখন চেষ্টা করেছে সেটাকে স্বাভাবিক করার জন্য। অর্থাত্ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের দায়িত্ব ছিল বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা। এটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্য। পৃথিবীর কোনো দেশেই, যেমন আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই, তাহলে আমরা দেখি (সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া) কখনোই বাজারের শেয়ারের দাম বাড়ল নাকি কমল, ইনডেক্স কমল নাকি বাড়ল এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের কাজ হলো বাজারের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনের কঠোর প্রয়োগ করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, আইনের কঠোর প্রয়োগ করা, ম্যানিপুলেটর এবং সার্কুলার ট্রেডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা, সে যত বড়ো, শক্তিশালী হোক না কেন।

প্রত্যেক কোম্পানির অডিট এবং প্রসপেক্টাসের সত্যতা যাচাই বাছাই করে তাদের রিকমেন্ডেশন নেওয়া। যদি কেউ প্রমাণিত হয় মিথ্যা তথ্য দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। যাতে বাজারে মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ড মার্কেট, অকশন মার্কেট, ডেরিভেটি, সরকারি ট্রেজারি বন্ড দ্বারা বিভিন্ন ভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেওয়া। বিভিন্ন লিস্টেড কোম্পানিতে করপোরেট কালচার এবং গুড গভর্নেন্স যাতে কার্যকর হয় সেটাকে নিশ্চিত করা। বিভিন্ন লিস্টেড কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য যে ইনডিপেন্ডেন্ট ডিরেকটর নিয়োগ দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে কড়া নজর রাখা। তারা যাতে পরিচালনা পরিষদ, স্পনসর ডিরেক্টর, ম্যানেজমেন্ট দ্বারা প্রভাবিত না হয়। যেহেতু ইনডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টররা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে কাজ করবে এবং স্বার্থ সংরক্ষণ করবে কাজেই সকল ডিরেক্টরদের হতে হবে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। অথচ বাংলাদেশের এর ব্যতিক্রম, কোম্পানির পরিচালকরা নিয়োগ দিয়ে থাকেন, কেউ কারো বন্ধু, কেউ কারো সাবেক কর্মচারী, কেউ কারো আত্মীয়, তারা যেখানে সাধারণ নিজেদের ইচ্ছামতো ইনডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নিয়োগ দিয়ে থাকে যারা শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে কোনো কাজই করে না। আমাদের দুর্ভাগ্য শুধু মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এবং কয়েকটি লোকাল কোম্পানি ছাড়া কোনো লিস্টেড কোম্পানিতে কোনো করপোরেট কালচার নেই, গুড গভর্নেন্স নেই একাউন্টিং-এর কোনো স্বচ্ছতা নেই, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কোনো সুব্যবস্থা নেই। আমরা যদি দেখি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা তাহলে দেখব সেখানে মালিক পরিচালক যারা আছেন তারা তাদের ইচ্ছামতো নিজেদের অ্যাপয়েন্টেড ঊর্ধ্বতন ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে একত্রিত হয়ে নিজেদের স্বার্থে সব কিছু করে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই, এক ব্যাংকের পরিচালক আরেক ব্যাংকের পরিচালকের যোগসাজশে নামে-বেনামে, আত্মীয়স্বজনের নামে, নিজস্ব কোম্পানির অধীনস্ত কর্মচারীর নামে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। সব সময় এসব তথাকথিত পরিচালকরা পুঁজিবাজারকে ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীকে ঠকিয়ে সময় এবং সুযোগ বুঝে ভালো বাজারে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে লাভবান হয়েছেন। অপরদিকে বিনিয়োগকারী এবং শেয়ারহোল্ডাররা বড়ো ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নতুন কমিশনের সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব হবে লিস্টেড কোম্পানিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষ করে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং শক্তিশালী ম্যানেজমেন্ট টিম গঠন করা যারা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে যারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং স্পনসর ডিরেক্টরদেরও প্রভাব মুক্ত থাকবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নতুন কমিশন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এই কাজটি সম্পন্ন হবে। বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করতে হবে শুধুমাত্র ইকুইটি মার্কেট দিয়ে পৃথিবীর কোনো মার্কেটে চলে না, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারও চলবে না।

কমিশনকে একটা জিনিস উপলব্ধি করতে হবে, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনবিএফআই গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন কোনো সিদ্ধান্ত যা শেয়ারহোল্ডারদের কে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বিএসইসি অবশ্যই শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে ভূমিকা রাখবে।

লেখক : সাবেক প্রেসিডেন্ট, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ