এইভাবে আর কতদিন?

আপডেট : ২৯ মে ২০২০, ২১:৫১

গত কয়েক মাস ধরিয়া সকলের মনে প্রশ্নটা প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাইতেছে—করোনা আর কতকাল থাকিবে? যুগে যুগে অনেক ভাইরাস মানবজাতিকে নাকানিচুবানি খাওয়াইয়াছে। দুই সহস্রাধিক বত্সর ধরিয়া প্লেগ দাপাইয়া বেড়াইয়াছে বিশ্বব্যাপী। ১৩৩১ সালে প্লেগে চীনের জনসংখ্যার অর্ধেক শেষ হইয়া গিয়াছিল। অতঃপর ১৩৪৭ হইতে ১৩৫১ অবধি ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়া ছারখার করিয়াছিল প্লেগ। ইউরোপের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ স্রেফ ‘নাই’ হইয়া গিয়াছিল প্লেগের দাপটে। সাময়িক বিরতির পর ১৮৫৫ সালে চীনে আবার ফিরিয়া আসে প্লেগ এবং ডানা মেলিয়া ধরে সমগ্র পৃথিবীতে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই সেই সময় সোয়া কোটি মানুষ মারা গিয়াছিল। অন্যদিকে ৩ হাজার বত্সর ধরিয়া প্রচণ্ড তাণ্ডব চালাইয়া বিশ্বের ১০ জনের মধ্যে তিন জনের মৃত্যু নিশ্চিত করিয়াছিল ‘ভ্যারিওলা ভাইরাস’ তথা গুটিবসন্ত। টিকার কল্যাণে মাত্র কয়েক দশক আগে ইহাকে বাগ মানানো গিয়াছিল। ১৯১৮ হইতে ১৯২০ অবধি স্প্যানিশ ফ্লুতে বিশ্বের ৫ কোটি মানুষের প্রাণ গিয়াছিল। এমনকি, ১৯৬৮ সালে ‘হংকং ফ্লুতেও মারা গিয়াছিল ১০ লক্ষাধিক মানুষ। এই ভাইরাসগুলি মানবশরীরে প্রবেশ করিত নাসাপথে, ছোঁয়াছুঁয়ির মাধ্যমে। এই সকল কয়টি রোগেই এই বিশ্বের মানুষ পরিচিত ছিল কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনের ব্যাপারে।

করোনার মতো এই সকল রোগ সহজে যায় নাই। কোনো ভাইরাস মাত্র দুই বত্সর, আবার কোনো কোনোটি ২ হাজার বা ৩ হাজার বত্সর ধরিয়া পৃথিবীর মানুষকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিয়াছে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাইয়াছে কোভিড-১৯ পৃথিবী হইতে কবে বিদায় লইবে। অন্তত ২০২২ সাল অবধি ইহার প্রকোপ থাকিবে বেশ নিষ্ঠুরভাবেই। হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক মহামারি বিশেষজ্ঞ বলিয়াছেন, গবেষণা হইতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাইতেছে যে, কোভিড-১৯ নিজে হইতে চলিয়া যাইবে না। আমাদের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ লইতে হইবে এবং ক্রমশ গোষ্ঠী প্রতিরোধের দিকে (হার্ড ইমিউনিটি) যাইতে হইবে। মুশকিল হইল, করোনার কারণে বিশ্বের অর্থনীতির কর্মকাণ্ড প্রায় শূন্য হইয়া পড়িয়াছে। এই বিশ্বের মুক্তবাজার অর্থনীতি দাঁড়াইয়াছিল কমিউনিকেশ বিপ্লবের কারণেই। আর সেই যোগাযোগব্যবস্থারই টুঁটি চাপিয়া ধরিয়াছে কোভিড-১৯। স্বাভাবিকভাবেই নিশ্বাস রুদ্ধ হইয়া আসিতেছে অর্থনীতির। রক্তচলাচল বন্ধ হইবার উপক্রম ইহার কমিউনিকেশনের শিরা-উপশিরায়।

বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হইল, এইভাবে আর কতদিন? ইহার উত্তর খুঁজিতে গিয়া হতাশা ব্যক্ত করিয়াছে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার বড়ো বড়ো রাষ্ট্রনেতা। ক্রমশ ৯৫ শতাংশ মানুষের যদি কোভিডে আক্রান্ত হওয়াটাই ভবিতব্য হইয়া থাকে, তাহা হইলে কেন ভয়ংকর অনিশ্চয়তায় পড়িয়া থাকিবে গোটা মনুষ্যসমাজ ও অর্থনীতি? সুতরাং মানবজাতিকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসকে সঙ্গে লইয়াই বাঁচিতে শিখিতে হইবে। আর যতদিন পর্যন্ত না ভ্যাকসিন আসিতেছে, ততদিন সংক্রমণ রুখিতে পাঁচটি বিষয়ের উপর জোর দিতেই হইবে—সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, চারপাশ পরিষ্কার রাখা, সামাজিক দূরত্ব মানিয়া চলা, করোনা পজিটিভ রোগীর কন্ট্যাক্ট ট্রাকিং এবং করোনার পরীক্ষা বৃদ্ধি। এই সকল নিয়ম মানিয়া ক্রমশ সকল কিছু মুক্ত করিয়াই বাঁচাইতে হইবে অর্থনীতিকে। ইহাই এই সময়ের নিঠুর বাস্তবতা।