করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে

আপডেট : ২৯ মে ২০২০, ২১:৫২

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

৮ মার্চ ২০২০ তারিখে বাংলাদেশে তিন জন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত বা কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ করোনাকালে যুক্ত হয়। মার্চ মাস ধরে দিনে এক দুই বা তিন জন বা কোনো দিন এক জনও নয় এবং মাসের শেষের দিকে চার-পাঁচ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্ত মানুষের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে। তখন শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা হতো স্বল্পসংখ্যক। মাসের শেষের দিকে এসেও দিনে ১ হাজারের বেশি নয়।

এপ্রিল মাসে পরীক্ষার আওতা আস্তে আস্তে বাড়ানো হয় এবং কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট সংখ্যা ৭ হাজার ৬৬৭ জনে উন্নীত হয়। অর্থাত্ এপ্রিল মাসে আক্রান্ত হন ৭ হাজার ৬১৮ জন। মে মাসে পরীক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা বাড়ে। এ পর্যন্ত এক দিনে (২৮ মে) ৯ হাজার ৩১০টি নমুনা পরীক্ষা করে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৯ জন শনাক্ত করা হয়। ২৮ মে পর্যন্ত এই মাসে মোট ৩২ হাজার ৭০৩ জন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এদিন পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্তকৃত মানুষের সংখ্যা ৪০ হাজার ৩২১। এ পর্যন্ত (২৮ মে পর্যন্ত) মোট মৃতের সংখ্যা ৫৫৯ জন। আজ (২৮ মে) যখন এই লেখা তৈরি করছি তখন দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি দেখা যায় দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। বিগত এক সপ্তাহে শনাক্তকৃত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় মোট সংক্রমিতসংখ্যা অনুযায়ী সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এখন ২২ নম্বরে।

সংক্রমিতদের মধ্যে মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা অনেক দেশ থেকে অনেক কম—সেই দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত রয়েছে, উভয় দেশে সংক্রমিতদের মধ্যে মৃত্যুহার বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। এটা ভালো খবর, তবে সংক্রমণ যদি ঐ দুই দেশের মতো বেড়ে যায় তখন মৃত্যুহার কত হতে পারে তা এখন বোঝা যাবে না। কাজেই সংক্রমণ অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে।

যাদের পরীক্ষা করা হয় তাদের মধ্যে সংক্রমিতদের হারও বাড়ছে। ২০ মে এই হার ছিল ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ, ২১ থেকে ২৪ মে গড়ে দিনে ১৭ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৭ মে গড়ে দিনে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২৮ মে তারিখে এযাবত্ সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এটি ভালো খবর নয়। এছাড়া শনাক্তকৃতদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের তেমন খুঁজে বার করে (ট্রেসিং) পরীক্ষা করা হচ্ছে না এবং একজন কোভিড-১৯ রোগী থেকে গড়ে কতজন সংক্রমিত হচ্ছে (রিপ্রোডাকশন সংখ্যা) তা হিসাব করা হচ্ছে না। ফলে খারাপের দিকে যাওয়া অবস্থা কত খারাপ হতে পারে তা বোঝা যাচ্ছ না। এই বাস্তবতায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার এবং রাখার কার্যক্রম সুদৃঢ় করার তীব্র তাগিদ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচেতনতার সঙ্গে ২৬ মার্চ থেকে সরকারি বেসরকারি সব অফিস বন্ধ ঘোষণা করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প, ছোটোবড়ো ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং অন্যান্য বেসরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলো এর আওতায় আসে। দেশে ব্যাপকভাবে লকডাউন আরোপ করা হয়। বাড়িতে থাকা, ঘনঘন সাবান দিয়ে যথানিয়মে হাত ধোয়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, বাইরে যদি যেতেই হয়, তাহলে মাস্ক পরা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি সবার মেনে চলার কথ বলা হয়—করোনা ভাইরাস থেকে নিজের সুরক্ষা এবং অন্যদের সুরক্ষায় সহায়তা করার জন্য।

প্রথমদিকে যাদের কোভিড-১৯ ধরা পড়ে, তারা সবাই ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশি অভিবাসী। এরপর আক্রান্ত বিদেশফেরতদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া যেতে থাকে। ২০২০-এর ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে অসংখ্য অভিবাসী দেশে ফিরে আসতে থাকেন। তাদের অধিকাংশ করোনা ভাইরাসসংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং কোয়ারেন্টাইন ও বিচ্ছিন্ন থাকার নির্দেশনা অনুসরণ করেননি। বরং তারা সাধারণভাবে চলাফেরা এবং সামাজিক মেলামেশা করেন। ফলে সংক্রমণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ে ব্যাপ্তি লাভ করে।

দেখা যায়, যখন ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হলো এবং বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন আরোপ করা হলো তখন সাধারণ মানুষ চলাফেরায় ও আচরণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিধিবিধান মানেননি। তাদের আচরণ এমন ছিল, যেন তারা স্বাভাবিক অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই জীবন যাপন করছেন। সেরকমটি এখনো চলছে। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যখন নামানো হলো তখনো উন্নতি হয়নি। কখনো নানা অজুহাত দেখিয়ে, কখনো-বা তাদের ফাঁকি দিয়ে বাজারহাটে যাওয়া এবং ঘোরাফেরা করা অব্যাহত রাখে অসংখ্য মানুষ। কখনো কখনো কঠোর হওয়ার চেষ্টা করে, এমনকি জরিমানা করেও পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীগণ অবস্থার তেমন পরিবর্তন আনতে পারেননি।

মে মাসের গোড়ার দিকে এক উল্লেখযোগ্য অঘটন ঘটল। তৈরি পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার কথা বলা হলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসংখ্য শ্রমিক দলে দলে ঢাকা আসেন হেঁটে বা কোনো ধরনের যান জোগাড় করতে পারলে তাতে চড়ে। কোনো শারীরিক দূরত্ব বা সুরক্ষা ছাড়াই। তারপর যখন কারখানায়গুলো খোলা হলো না, তখন তারা আবার সেভাবেই ফিরে যান। কিছুসংখ্যক হয়তো ঢাকা থেকে যান। কিন্তু যা ঘটল তা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি যে অনেক বাড়াল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও প্রায় হাল ছেড়ে দেন বলা যায়, কেননা তাদের উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ব্যাপক মানুষ করোনাকালে করণীয় ও বর্জনীয় সমূহের তোয়াক্কা না করেই তাদের মতো করে জীবন যাপন করতে থাকেন। ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই বলা যায় ঈদের বাজার করার সুযোগ দেওয়ার জন্য দোকানপাট খোলার ব্যবস্থা করা হলো। মানুষের যেন ঢল নামল ঈদের জন্য কেনাকাটা করতে, বিশেষ করে ঢাকার ফুটপাতের দোকানগুলোতে। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই—শহর গ্রাম সর্বত্রই মানুষ মূলত নিজেদের ইচ্ছামতো চলাফেরা করতে থাকেন। মানুষের বিবেচনাহীনতার একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। একজন নারী তার ছোটো একটি মেয়েকে নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে ঢাকার এক বাজারে এসেছেন। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে কথা বলা হয় এবং শোনানো হয়। তিনি নিজে মাস্ক পরেননি, মেয়েকেও পরাননি। বললেন মেয়ে বায়না ধরেছে নতুন জামা কিনে দিতে হবে, তাই তিনি তাকে নিয়ে বাজারে এসেছেন। এটি একটি উদাহরণ, কিন্তু দিকে দিকে বিস্তৃত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আর এসবের মধ্য দিয়ে বাড়তে থাকল করোনা ভাইরাস সংক্রমণঝুঁকি।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে ধারণা করা যায় যে, দেশ বহুবিস্তৃত কোভিড-১৯ ঝুঁকিতেই শুধু নয়, খুব সম্ভব ব্যাপকভাবে এর কবলে চলে যাচ্ছ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যে স্বাস্থ্যবিধি মানা, বাড়িতে থাকা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ঘোষণা দেন এবং তা পালন করার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করেন তা সেভাবে অনুসৃত হয়নি। একদিকে দেশের অসংখ্য মানুষ তা তেমন পালন করেননি আর অন্যদিকে যাদের তা নিশ্চিত করার কথা তারা সেভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে তা করেননি। ফলে আজকের নাজুক অবস্থার উদ্ভব হয়েছে।

তারপর ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার হিড়িক শুরু হয়। লাখো মানুষ সড়ক-মহাসড়কে ভিড়ের পর ভিড় সৃষ্টি করে বাড়ি গেলেন। প্রথমে ঢাকা থেকে বাইরে এবং বাইরে থেকে ঢাকা আসা নিষিদ্ধ করা হয়, পরে ব্যক্তিগত যানবাহনে আসা যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যাদের মোটরগাড়ি আছে তাদের তো কথাই নাই, অন্যরাও ভাড়া করা মোটরগাড়ি নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে এবং আরো অনেক মানুষ হেঁটে রওনা হন এবং পথে যখন যা পাওয়া যায় (তিন চাকার যান, রিকশা ইত্যাদি) তা চড়ে বা হাঁটতে হাঁটতেই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যান। কোনো সামাজিক দূরত্ব, কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই নাই। ফলে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রভূত পরিমাণে বাড়ল। তারা আবার ঢাকা ফিরছেন একইভাবে হইহুল্লুড় করে এবং আরো এক দফা বাড়াচ্ছেন সংক্রমণঝুঁকি।

এসব কারণে দেশব্যাপী বিপুল সংক্রমণের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে তা রোধকল্পে একদিকে কোভিড-১৯-সংক্রান্ত বাস্তব চিত্র জানা এবং সে অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য শনাক্তকরণ নমুনা পরীক্ষা অনেক বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সবাই যেন এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি পালন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখেন এবং অন্যান্য বিধিবিধান মানে তা জরুরি ভিত্তিতে নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নাই। দ্বিতীয় কাজটি করা গেলে পরীক্ষা বাড়ানোর ক্ষেত্রে চাপ কিছু কম হতে পারে। তাই এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। মানুষের যখন নিয়মনীতি মানতে অনীহা থাকে তখন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে। করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে অসংখ্য মানুষের অব্যাহত অসহযোগিতায় এরকম একটি অবস্থা এখন বাংলাদেশে বিরাজ করছে। তাই আমার মনে হয়, এখনই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করে কোভিড-১৯ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মানুষের চলাফেরা ও আচার-আচরণে প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা আনয়নের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সারাদেশে হয়তো নয়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে (কম ঝুঁকি, মধ্যম ঝুঁকি, বেশি ঝুঁকি ইত্যাদি) দেশকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে প্রয়োজন অনুসারে দ্রুত সান্ধ্য আইন জারি এবং কার্যকরভাবে অন্যন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করতে হবে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, যা প্রয়োজন তা-ই করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

পরিস্থিতি যেরকম অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে সেরকমটি যদি না ঘটে তাহলে ভালো। তবে আশঙ্কা অনুযায়ী পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। কেননা জীবন ও স্বাস্থ্যগত এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সম্ভাব্য নিম্নতম পর্যায়ে সীমিত রেখে আমাদেরকে এই করোনাযুদ্ধে জিততে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাস্তবানুগ বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এমন অর্জন সম্ভব।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ