ড. মো. মাছুমুর রহমান
জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি বিষয়, যা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে জলবায়ু পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকে পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু এবং ধারাবাহিকভাবে এর প্রভাব পড়ছে মানুষ ও পরিবেশের ওপর। জলবায়ু, পরিবেশ ও মানুষ একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়ভাবে জড়িত আর এদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ আন্তঃসম্পর্কযুক্ত।
জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে একটি সমন্বিত উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, সুশীল সমাজ ও ব্যবসায় খাতের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের সূত্র অনুযায়ী আরো জানা যায়, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাব এবং সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্যের মধ্যকার সম্পর্ক অনুধাবনের জন্য একটি নীতি গবেষণা ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই সমীক্ষার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা দিতে পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুগুলোকে সম্পৃক্ত করা। বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে ‘জলবায়ু পরিবর্তন সেল’ গঠন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন সেলের কাছে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজনের লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুগুলোকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রমাণিত ভালো অভিযোজন কলাকৌশলসমূহ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন মর্মে অনুভূত হয়।
এবার আসা যাক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে অতি সম্প্রতি হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট, হেলথ অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টের ডিরেক্টর আরনবার্নস্টাইন এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, স্বাস্থ্যকে পরিবেশনীতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে দেখা ‘একটা বিপজ্জনক বিভ্রম’। প্রকৃতপক্ষে কি কোনোভাবেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে পরিবেশনীতিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা সম্ভব? বিষয়টি নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তাই এ বিষয়ে হয়তো অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতে আরো অনেক গবেষণা এবং অনেক রকমের মতামত আসবে। করোনা পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীর মানুষ বিশুদ্ধ বায়ুতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কয়েক দিন আগেও কি তা সম্ভব ছিল? এইতো সেদিনও শুনেছি বেইজিং ও দিল্লির মতো শহরগুলোর মানুষ নিঃশ্বাসে বিষ গ্রহণ করছে। অথচ এই মুহূর্তে করোনা পরিস্থিতি নির্মল বায়ু সেবনে কতই না গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। করোনার কারণে আকাশ কত স্বচ্ছ ও নীল। আমাদের ঢাকা শহরের মানুষও কতদিন এই নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারেনি, তার কি কোনো খবর আমরা রেখেছি? আর এর প্রধান কারণ সারা পৃথিবীর মানুষ এখনো অবরুদ্ধ। করোনায় অবরুদ্ধ থাকার (লকডাউন) জেরে আকাশ-বাতাস এখন অনেক স্বচ্ছ। কিন্তু বাতাস যতই পরিষ্কার হোক, জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে দেখলে লকডাউন আদৌ ভালো ব্যাপার নয়। এ কারণে হয়তো এই খাতে খরচ কমানো হবে, জলবায়ু সম্মেলন হয়তো সময়মতো না-ও হতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাজনৈতিক উদ্যোগও কমে যেতে পারে। এ রকম একটি বাস্তবতায় এমআইটির ভিউয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অবশ্যই গুরুত্বের দাবি রাখে। এমআইটি তাদের রিভিউ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, করোনাজনিত কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এমনটা ধরে নেওয়া ভুল হবে। এক্ষেত্রে একটা বড়ো আশঙ্কা যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা বন্ধ না হলেও অতিমাত্রায় তা কমে যেতে পারে এবং করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পরেও ফের তা নিয়ে আলোচনা শুরু করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত গবেষণাই যে থেমে আছে বা ধাক্কা খেয়েছে এমনটা নয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, করোনাজনিত কারণে অন্য সমস্ত ল্যাবরেটরি রিসার্চই বন্ধ। তার কারণ হলো, গবেষক ও চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের এখন এক ও একমাত্র করোনা ভাইরাসের দিকে নজর দিতে হচ্ছে। তাছাড়া অবরুদ্ধ (লকডাউন) থাকার কারণে, বাড়ি থেকে কাজ ও সামাজিক দূরত্ব বিধির জন্য অন্য গবেষণাগুলো প্রায় বন্ধ। অনেককে এমন কথাও বলতে শুনেছি, কোভিড-১৯ এক আপত্কালীন সংকট, এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশের মতো বিষয়গুলো কি কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে না?
একবার ভেবে দেখুন তো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং তা মোকাবিলা করা মানব জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয় কি? আর অতি অবশ্যই বর্তমানে বাড়তে থাকা স্বাস্থ্য সংকটের কারণে মানব জাতির টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড়ো বিষয়। কিন্তু তা এই মুহূর্তে প্রয়োজন হলেও মানব জাতির স্বার্থেই জলবায়ুনীতির বিষয়টি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা কতটুকু যৌক্তিক তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
n লেখক :যুগ্ম সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
