করোনার ঝুঁকিতে পথশিশুরা

আপডেট : ২৯ মে ২০২০, ২১:৫৬

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

করোনা ভাইরাসের কবলে সারা বিশ্ব। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। কিন্তু করোনার লকডাউনে কতটা সুরক্ষিত দেশের ছিন্নমূল পথশিশুরা? করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সব মানুষ যখন ঘরে, তখন ঘরহীন পথশিশুরা দল বেঁধে ঘুরছে, খেলছে। তারা রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, কোনো ভবনের নিচে জটলা করছে, পাশাপাশি ঘুমাচ্ছে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, এরা নিজেরা যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে, তেমনি এদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে সুপারশপ স্বপ্ন ও মীনা বাজারের সামনে দেখা যায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জটলা। সুপারশপে কোনো গাড়ি এসে দাঁড়ালেই হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইতে দেখা যায় শিশুদের। সরেজমিন রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড, রমনা পার্কসহ বিভিন্ন স্থানে পথশিশুদের জটলা করে খেলতে কিংবা আড্ডা দিতে দেখা যায়। এদিকে সবকিছু বন্ধ বলে নিয়মিত খাবার জুটছে না তাদের।

কমলাপুরের পথশিশু আলম। স্টেশনে কুলির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এখন কোনো কাজ নেই। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জানতে চাইলে আলম বলে, ‘হ, আমি জানি করোনা হইলে মানুষ মরে। এই রোগের কারণে সব অফিস বন্ধ কইরা দিছে। আমরা তো না খাইয়া মরতাছি, কোনো কামকাজ নাই। ভিক্ষাও পাই না।’

ধানমন্ডিতে কথা হয় আসলামের সঙ্গে। সে বলে, ‘করোনা ভাইরাস কাশি রোগ, সেরকম কিছু না।’ এই রোগের বিপদ সম্পর্কে জানালে সে বলে, ‘আফা, আমগো কিচ্ছু হইব না, আমাগো মরণ নাই।’

প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বাড্ডায় বসে ছিলেন হোসনে আরা। করোনা ভাইরাস বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে হোসনে আরা জানান, ‘ট্যাকা দিলে কথা কমু।’ ১০ টাকার বিনিময়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি এটি হাত ধোয়া রোগ, হাত ধুইলে হয় না। হুনছি বিদেশ থেইকা এই রোগ আইছে, এইডা সবার হইতেছে।’

একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পথশিশুদের সংঘবদ্ধ চলাফেরা ও রাতযাপনের কারণে করোনা ভাইরাসের বাহক হিসেবে খুব ঝুঁকির মধ্যে আছে এরা। সংক্রমণ ঠেকাতে এই পথশিশুদের নিরাপদ স্থানে রাখার পরামর্শ তাদের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মো. মোজাহেরুল হক বলেন, করোনা মহামারিতে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছিন্নমূল মানুষ। তারা গাদাগাদি করে অনেকে একসঙ্গে থাকে। বস্তির রাস্তাগুলো অনেক সরু হওয়ায় তাদের একজন অপরজনের শরীরের সংস্পর্শে আসতেই হচ্ছে। ত্রাণ বিতরণের যেকোনো অব্যবস্থাপনাও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হচ্ছে বলে জানান। তিনি বলেন, স্বল্প আয়ের এসব মানুষ ত্রাণের আশায় বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে আসছে। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে তারা মৃত্যুর ঝুঁকি নিচ্ছে। কেউ সচেতন নয়, কেউ বা করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতার বিষয়টি পাত্তাই দিচ্ছে না। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুস সহিদ মাহমুদ বলেন, সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছে পথশিশুরা। কেননা, তারা এ সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখে না। ফলে এদের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। নিজেদের কমিউনিটিতে এরা ঝুঁকি তৈরি করবে। এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে, রাতের বেলা একসঙ্গে থাকে। সরকারের বাজেটে পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম আছে। অন্তত মেগা সিটিগুলোতে যে শিশুরা আছে, তাদের জন্য করোনায় বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।