করোনা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা

আপডেট : ৩০ মে ২০২০, ২১:৪৪

দীপক বিশ্বাস

করোনা পরিস্থিতির আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী  কোনো একক ঘটনায় আমেরিকায় সব থেকে বড়ো প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ভিয়েতনাম যুদ্ধে। এই যুদ্ধে সামরিক-বেসামরিক মিলে সর্বমোট প্রাণ হারায় ৫৮ হাজারের বেশি কিছু আমেরিকান। করোনা ভাইরাসে সংঘটিত প্রথম মৃত্যুর পর মাত্র ৮০ দিনে এই সংখ্যা অতিক্রম হয়। ৯০ দিনের মাথায় মৃত্যুর সংখ্যাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘটিত সব যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসী হামলায় নিহত আমেরিকানদের সর্বমোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক করোনা শনাক্ত রোগী আমেরিকায়। করোনায় প্রাণহানীর সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি এই দেশে। দেশটির লেবার ডিপার্টমেন্ট জানাচ্ছে, মার্কিন ইতিহাসে রেকর্ড ৩৯ মিলিয়ন লোক ইতিমধ্যে ‘জবলেস’। অবশ্য গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংকটময় পরিস্থিতিকে ‘অ্যা ব্যাজ অব অনার’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলপূর্ণ দুর্যোগ’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, মহাশক্তিধর এই দেশ কেন এমন অবস্থার শিকার হলো? এটা কি কেবল স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা, নাকি শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থতা? নাকি এর মধ্যে জড়িত আছে চিরাচরিত কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্ব, যার মূলে কাজ করেছে অতিদলীয় পরিচয়ের বিভাজন?

মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ চারে রাজ্যসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে স্বতন্ত্র ও সহগামী এ দুই ধরনের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। স্বতন্ত্র ক্ষমতা হলো সেই ক্ষমতাগুলো, যেগুলো কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের জন্য আলাদাভাবে নির্ধারিত। রাজ্য সরকারের স্বতন্ত্র ক্ষমতার মধ্যে আছে নির্বাচন পরিচালনা, স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ, সংবিধানের সংশোধনী অনুমোদন, আন্তঃরাজ্য বাণিজ্য পরিচালনার মতো বিষয়াদি। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বতন্ত্র ক্ষমতাগুলোর মধ্যে আছে মুদ্রা প্রণয়ন, আন্তঃরাজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা, ডাক বিভাগ, যুদ্ধ ঘোষণা, সামরিক বাহিনী পরিচালনা, বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের মতো দিকগুলো। অন্যদিকে সহগামী ক্ষমতা হচ্ছে সেই ক্ষমতাগুলো, যা রাজ্য ও কেন্দ্র উভয়ে একই সঙ্গে প্রয়োগ করার এক্তিয়ার রাখে। এর মধ্যে আছে কর ব্যবস্থাপনা, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠা, জাতীয় স্বার্থে জমি অধিগ্রহণ, কোর্ট প্রতিষ্ঠা, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ প্রভৃতি। আমেরিকান সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় সমস্যার সমাধান করতে কেন্দ্র ও রাজ্যের পারস্পরিক কারিগরি ও কাঠামোগত সহযোগিতা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, মার্চের ১ তারিখে নিউ ইয়র্কে প্রথম করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্তের পরদিনই নিউ ইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো কিছু সিদ্ধান্ত নেন। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল স্বাস্থ্য-বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ফি মওকুফ, ৪০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের একটি তহবিল গঠন ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে গভর্নর কুমো আরো কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেন। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একটি কেন্দ্রীয় ‘ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার’ চালু করা, বেকার ভাতা প্রদান দ্রুত করা, বিদ্যুত্-পানিসহ অন্যান্য বিল সাময়িক স্থগিত করা এবং তিন মাসের মর্টগেজ মওকুফ। সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে পুরো রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করেন তিনি। ছোট্ট শহর নিউ রোশেল এলাকায় ‘ওয়ান-মাইল কনটেইনমেন্ট’-এর মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণ রোধের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের একপর্যায়ে গভর্নর কুমো একটি খোলা চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি কঠোর, সর্বজনীন অভিন্ন জাতীয় কৌশল নির্ধারণের জন্য অনুরোধ করেন। এই আহ্বানের মধ্যে তিনি সেনাবাহিনীর দক্ষ প্রকৌশলী শাখাকে কাজে লাগিয়ে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, দৈনিক টেস্টিংয়ের সংখ্যা বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর ও রাজ্যগুলোতে কড়াকড়িভাবে ‘শাটডাউন’ ঘোষণা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য গভর্নর কুমোর ডাকে সাড়া দেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। উল্লেখ্য, ট্রাম্প হচ্ছেন রিপাবলিকান পার্টি থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে কুমো হচ্ছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিক। কুমোর ডাকে ট্রাম্পের সাড়া না দেওয়ার পেছনে দলের পরিচয় একটি কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

পাঁচ মাস পরেই প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে অভিসংশিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ রিপাবলিকানরা লকডাউনের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক স্থবিরতাকে রাজনৈতিক ব্যর্থতা মনে করছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা ডেমোক্রেটিক পার্টির গভর্নররা কঠোর লকডাউনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, কড়াকড়ি শাটডাউন অথবা সম্পূর্ণ পরিসরে অর্থনীতি চালুকরণের মধ্যে যেকোনো একটি নয়, বরং এ দুটির বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বয় সাধনই পারে এই মহাদুর্যোগ থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করতে।

n লেখক :ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শিক্ষার্থী