বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

আপডেট : ৩০ মে ২০২০, ২১:৪৪

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আজ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধূমপান করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকি ১৪ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন যে, তামাক সেবনকারীরা নানা রকম জটিল ও কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে থাকে বিধায় কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এবং প্রাণহানির ঝুঁকিতে সবার ওপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর কারণ হিসেবে বলছে, সিগারেট সেবনে হাতের আঙুলগুলো ঠোঁটের সংস্পর্শে আসে এবং এর ফলে সিগারেটের ফিলটারে বা হাতে লেগে থাকা ভাইরাস মুখে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ (প্রায় ১৪ গুণ) বেড়ে যায়। অন্যান্য কারণ হচ্ছে—ধূমপায়ীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তের সম্ভাবনাও  অনেক  বেশি—যা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহু মাত্রায় বাড়াতে পারে। তাছাড়া, ধূমপান শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমেই কমাতে থাকে এবং সহজেই করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এমনকি অকাল মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে—যেমনটি হয়েছে চীনে ও জার্মানিতে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— যেসব শিশু ধূমপায়ীর সংস্পর্শে আসে তাদের তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। অতএব, ধূমপায়ী ধূমপান বন্ধ করলে পরিবারের ধূমপান সম্পর্কিত অসুস্থতার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। পরোক্ষ ধূমপান এক্সপোজার হ্রাস করা বিশেষত বাচ্চাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফুসফুসের ভাইরাসগুলি দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে মারাত্মক অসুস্থতার কারণ হতে পারে। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এটি একই রকম হতে পারে। এজন্য ধূমপায়ীদের যদি দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে তবে অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া উচিত। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে, এর ফলে সৃষ্ট অন্যান্য ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে। সুতরাং, এখনই ধূমপান যারা ছাড়তে চান তাদের নিকটিনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবার জন্য নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির (এনআরটি) সন্ধান করা প্রয়োজন। ধূমপান মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দেয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে—ঝুঁকি কমাতে তাই ধূমপান ছেড়ে দিতেই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন। ‘মহামারির এ সময়ে ধূমপান ছেড়ে দেওয়া কেবল ধূমপায়ী নিজের জীবন বাঁচাতে পারে তাই নয়, আক্রান্ত হলেও আপনার হয়তো হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না, এভাবে আপনি অন্য আরেক জনের প্রাণও বাঁচাতে পারেন,’ বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যাপক ড. জনাধন উইনিকফ। ম্যাসাচুসেটসের অ্যাটর্নি জেনারেল মরা হিলিকে নিয়ে উইনিকফ বৃহস্পতিবার যৌথভাবে অঙ্গরাজ্যটির বাসিন্দা বিশেষ করে তরুণদের উদ্দেশে এক নির্দেশনাও দিয়েছেন। এতে ধূমপান ও ভ্যাপিংয়ের ই-সিগারেটের মাধ্যমে ধোঁয়া সেবনের কারণে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ‘আপনি ঐ যন্ত্র কিংবা সিগারেট মুখের কাছে আনছেন, ধোঁয়া টেনে ভেতরে নিচ্ছেন। এভাবে আপনি হাতে যা যা (জীবাণু) আছে তা শরীরের ভেতর পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ধূমপায়ী অনেক রোগীকে অন্যদের তুলনায় বেশি কাশি দিতে ও শ্লেষ্মা নির্গত হতে দেখা যায়। কয়েকটি গবেষণা বলছে, ই-সিগারেট ফুসফুস ও শ্বাসনালির জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে। করোনা ভাইরাসের এই সময়ে পান, সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, সাদাপাতা ইত্যাদি তামাকজাতীয় খাবার যারা গ্রহণ করবেন তাদের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন বেশি তেমনি রোগের জটিলতা ও ভোগান্তি অন্যান্য অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি, তাই ধূমপান বন্ধ করা যেমন জরুরি তেমনি জর্দা, গুল, সাদাপাতা ইত্যাদি খাওয়া বন্ধ করা প্রয়োজন।

বিভিন্ন নেশা বা বদ অভ্যাস দূর করা যেমন— ধূমপান শুধু নিজেকে না পরোক্ষভাবে বাড়িতে মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, সন্তান—সবাইকে সমানভাবে ক্ষতি করে, সেই সঙ্গে মাদকের নেশা যেমন—গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা কিংবা মদ্যপান আমাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ শক্তি নষ্ট করে। করোনা ভাইরাস যেমন আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে তেমনি ধূমপান বা ই-সিগারেট কিংবা সিসা সমানভাবে আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে।

সবচেয়ে বড় কথা, কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে নিজেদের ও আমাদের আত্মীয়স্বজনসহ আশপাশের মানুষকে রক্ষা করতে সরকারের সব বিধিনিষেধ এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশিকা মেনে চলা প্রয়োজন। কারণ, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয় ও নিরাপদ।

n লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং শব্দসৈনিক, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস (মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা)