মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র। পুলিশ হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ন্যায় বিচারের দাবিতে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০টি বড়ো শহরে বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ওকল্যান্ড ও ডেট্রয়েট শহরে সহিংসতায় কমপক্ষে দুই জন নিহত হয়েছেন। পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মিনিয়াপোলিস, সেন্ট পল, পোর্টল্যান্ড শহরে রাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা জড়ো হলে কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে হোয়াইট হাউস। এ দিকে ফ্লয়েডের হত্যার ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক চাওভিনকে শুক্রবার আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও দায়ের হয়েছে। এই পুলিশ কর্মকর্তা ফ্লয়েডের ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে মাটিতে চেপে ধরেছিলেন। সোমবার তাকে আদালতে তোলা হবে। তবে ফ্লুয়েডের পরিবার ও বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, সন্দেহভাজন চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ আনার পরই কেবল ন্যায় বিচার সম্ভব হতে পারে। খবর: সিএনএন, বিবিসি ও আলজাজিরা।
গত সোমবার মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশ হেফাজতে মারা যান কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক পুলিশ কর্মকর্তা ফ্লয়েডের ঘাড়ের ওপর হাঁটু দিয়ে তাকে মাটিতে চেপে ধরে রেখেছেন। সে সময় ফ্লয়েড বলতে থাকেন, প্লিজ, আমি শ্বাস নিতে পারছি না, আমাকে মারবেন না। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে ফ্লয়েডকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গতকাল সিএনএনের প্রকাশ করা আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিন জন পুলিশ সদস্য জর্জ ফ্লয়েডকে মাটিতে চেপে ধরেন। পুলিশ জানায়, ফ্লয়েডের কাছে জাল নোট থাকার খবর পেয়ে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ফ্লয়েড কর্মকর্তাদেরকে বাধা দেন এবং গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে আগেই বরখাস্ত করা হয়েছে।
ফ্লয়েডের মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘু কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে পুলিশের নৃশংসতার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে এক হাজারের বেশি মানুষ। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, পুলিশের গুলিতে নিহতদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশিরভাগই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারি সংস্থার চালানো জরিপে দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তিনগুণ বেশি মারা যায় কৃষ্ণাঙ্গরা। এসব হত্যার ঘটনায় বিচার খুব কমই হতে দেখা গেছে। যে কারণে গত সোমবার পুলিশ হেফাজতে ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর থেকেই ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। মিনিয়াপোলিস শহরে ইতিমধ্যে বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। থানাসহ বেশ কিছু ভবনে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষোভকারীরা।
শুক্রবার এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড়ো বড়ো শহরে। যেখানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বাধে। নিউইয়র্ক, আটলান্টা এবং আরো কিছু শহরে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউজের সামনে জড়ো হলে কিছু সময়ের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাসভবন ও কার্যালয় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না’ বলে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এ বাসভবনের প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার পথগুলো বন্ধ করে দেন। হোয়াইট হাউজের বাইরে সারা রাত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের থেমে থেমে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডকে ভয়াবহ ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, জর্জ ফ্লয়েডের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদেরকে তিনি দারুণ মানুষ বলে মন্তব্য করেন করেন।
সহিংস বিক্ষোভের কারণে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে। মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পল শহরে শুক্রবার ও শনিবার রাত আটটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। তবে শুক্রবার রাতে কারফিউ ভঙ্গ করে রাস্তায় নামে বিক্ষোভকারীরা। বেশকিছু গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে তারা। মিনিয়াপোলিসের যেসব জায়গায় পুলিশ সদস্যরা কম ছিল সেখানে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ৫০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
মিনেসোটা রাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ গতকাল সকালে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক ও নজিরবিহীন। বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা এবং সম্ভাব্য ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে আগে থেকে গুরুত্ব না দেওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেছেন। এই অবস্থায় মিনিয়াপোলিসে মোতায়েনের জন্য পেন্টাগন সেনাবাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে।
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, সহিংস বিক্ষোভের মুখে জর্জিয়ার আটলান্টায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। অরেগনের পোর্টল্যান্ড জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর কারফিউ জারি করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক, লস এঞ্জেলস, শিকাগো, ডেনভার, হিউস্টন, লুইজভিল, ফিনিক্স, কলম্বাস ও মেম্ফিসসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে শুক্রবার পুলিশের সঙ্গে প্রতিবাদকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে।
