একটুখানি ভালো থাকিবার জন্য জীবন বাজি রাখিয়া তাহারা দুর্গম-গিরি কান্তার মরুপথ পাড়ি দিয়া অবশেষে পৌঁছাইয়াছিল লিবিয়ায়। এই যাত্রা শুরু হইয়াছিল গত ডিসেম্বরে। অবর্ণনীয় নারকীয় এই পথ। দুঃস্বপ্নের মতো কাটিয়াছে প্রতিটি রজনী; কিন্তু তাহার পরও শেষ রক্ষা হয় নাই। লিবিয়ায় পাচারকারীদের হাতে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশি ২৬ জন তাজা তরুণ প্রাণ হারাইয়াছেন। জানা গিয়াছে, কিছুদিন পূর্বে সুদানের আরো কয়েক জন নাগরিকের সহিত এই বাংলাদেশি তরুণেরা লিবিয়ায় দুই দফা অপহরণের শিকার হইয়াছিলেন। প্রথম দফা অপহরণের পর মুক্তিপণ দিয়া তাহারা ছাড়া পান। তবে দ্বিতীয় দফায় চাহিদামাফিক অর্থ দিতে না পারায় অপহরণকারীরা তাহাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে অপহরণকারী দলের হোতাসহ দুই জনের মৃত্যু হয়। তাহার পরই অপহরণকারীরা নির্বিচারে জিম্মিদের উপর গুলি চালাইলে ২৬ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নিহত হন। আহত হন আরো ১১ জন। আমরা এমন হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। ইতিমধ্যে পাচারকারী সিন্ডিকেটের এক সদস্য ঢাকায় গ্রেফতার হইয়াছে।
প্রায় সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের এই দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর বৃহত্ একটি অংশ বিদেশে যাইবার ব্যাপারে মরিয়া হইয়া থাকে। এমনিতেই দেশে কর্মসংস্থানের অভাব, তাহার উপর তরুণ জনগোষ্ঠীর সামনে অসংখ্য উদাহরণ রহিয়াছে প্রবাসীদের আর্থিক সাফল্যের। হয়তো দেখা গিয়াছে, পাশের বাড়ির দিন-আনি-দিন-খাই পরিবারের ছেলে জায়গাজমি বিক্রয় করিয়া বিদেশে যাইবার কয়েক বত্সর পরই তাহাদের বাঁশের বেড়া আর ছনের কাঁচা ঘরখানি পাকা হইয়া গিয়াছে। বত্সর না ঘুরিতেই একতলা বাড়ি হইয়া গিয়াছে দোতলা! বিদেশ যাওয়া তো নহে, যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া! এমন সচ্ছলতার দৃষ্টান্ত এবং প্রবাসীদের সাফল্যগাথা দেশের তরুণদের পিপীলিকার মতো বিদেশের আগুনে ঝাঁপ দিতে উদ্বুদ্ধ করে; কিন্তু তাহারা জানেন না চেরাগের নিচে রহিয়াছে ঘন অন্ধকার। বিশেষ করিয়া অবৈধ পথে যাহারা স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছাইতে চাহেন, তাহাদের বৃহত্ একটি অংশ জীবন হাতে করিয়া দুর্বিষহ এক পাচারপথ ধরিয়া ভূমধ্যসাগরের তীরে পৌঁছান। অতঃপর গ্রীষ্মের অপেক্ষায় থাকেন, যখন এই উত্তাল সাগর কিছুটা শান্ত হইবে। তাহার পর খোলামকুচির মতো পলকা জলযানে করিয়া তাহারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া ইউরোপে প্রবেশ করিতে চাহেন; কিন্তু বেশির ভাগ সময় তাহারা ধরা পড়েন সীমান্তরক্ষীদের হাতে। বহু ক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগরেই তাহাদের সলিল সমাধি ঘটে। এই সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গিয়াছে, এমন অসংখ্য অভিবাসন প্রত্যাশী রহিয়াছেন, যাহারা বিভিন্ন জায়গায় আটকা পড়িয়া জেল খাটিয়া পুনরায় পাচারকারীদের টাকা দিয়া স্বপ্নের দেশে যাইতে চাহিয়াছেন; কিন্তু শেষাবধি দেখা গেল, স্বপ্নের দেশে পৌঁছাইবার পরও বৈধ হইতে পারেন নাই। মানবেতর জীবনই যেন তাহাদের নিত্যসঙ্গী হইয়া উঠিয়াছে!
প্রবাসে প্রায় সোয়া এক কোটি বাংলাদেশি থাকেন। প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের অর্থনীতির বড়ো শক্তি। সুতরাং এই সকল তাজা প্রাণ যাহাতে অকালে ঝরিয়া না যায়, তাহার জন্য এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে সচেতন করিতে হইবে। ইহা করিতে হইবে সমন্বিত উদ্যোগে। এই ধরনের মৃৃত্যু মানিয়া লওয়া যায় না।
