সর্বক্ষেত্রে ‘শর্টকাট’ জাতিকে কর্মবিমুখ ও পঙ্গু করছে

আপডেট : ০১ জুন ২০২০, ২১:৪৪

ড. মো. নাছিম আখতার

এক রাজা তার রাজ্যের কর্মবিমুখ অলস লোকগুলোকে রাজ্যের কোষাগার থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেল দেশের প্রায় অর্ধেক প্রজাই অলসাশ্রমের বাসিন্দা হয়েছে। রাজা ভীষণ বেগতিক অবস্থার মধ্যে পড়লেন। দেশের অর্ধেক প্রজাকে বসে বসে খাওয়ানো স্বয়ং রাজার পক্ষেও অসম্ভব। তাই রাজা বললেন, অলসাশ্রমের আশ্রিতদের মধ্য থেকে সত্যিকার অলস খুঁজে বের করতে হবে। সভাসদগণের পরামর্শে প্রকৃত অলস খুঁজতে গভীর রাতে অলসাশ্রমে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। আগুন জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার প্রায় সব মানুষই দৌড়ে পালাল। শুধু চার জন মানুষের ঘুম কিছুতেই ভাঙল না। এদের মধ্যে একজন আগুনের আলো অনুভব করে ঘুমের মধ্যেই বলে উঠল ‘কত রবি জ্বলে-রে’। তার এই কথা শুনে আরেক জন অলস চোখ না খুলেই বলে উঠল ‘কে বা আঁখি মেলে রে’। তৃতীয় অলসের দেহে আগুনের আঁচ লাগতেই চোখ না খুলেই বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার কথোপকথনের সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে আর্তস্বরে বলে উঠল, ‘পিপু’ অর্থাত্ পিঠ পুড়ে গেল। চতুর্থ অলস প্রত্যুত্তরে বলল ‘ফিশু’ অর্থাত্ ফিরে শো। রাজা সমস্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলেন এবং সবশেষে তিনি শেষের চার জনকে ছাড়া সবাইকে অলস আশ্রম ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভার্চুয়াল, বাস্তব—উভয় জীবনে রাজার সেই প্রকৃত অলসের মতো অসংখ্য অলস সমাজের যত্রতত্র চোখে পড়ছে। তারা নিজেরা জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে পড়ছে সঙ্গে সঙ্গে জাতিকেও পিছিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি আমার এক মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছাত্রী কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে তোলা তার একটি সুন্দর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছে। ছবিটি দেখে তার একজন ফেসবুক ফ্রেন্ড মন্তব্যে লিখেছে ‘এনসি’। অনেক চেষ্টার পর আমি বুঝতে পারলাম এর অর্থ হলো ‘নাইস’। এখানেই শেষ নয়, আমার সেই শিক্ষার্থী আরো অভিনব উপায়ে সংক্ষিপ্ত প্রত্যুত্তর দিয়েছে। রিপ্লাই অপশন ক্লিক করেই কিছু না লিখে এন্টারে চাপ দিয়েছে। আমার এক পরিচিতা ফেসবুকে নিজের একটি ছবি দিয়ে ক্যাপশনে বাংলাতে লিখেছেন ‘ফক্রে আম্মু’। আমি বেশ অনেকক্ষণ চিন্তা করে বের করলাম এটা আসলে ‘ফটো ক্রেডিট’ এর সংক্ষিপ্ত ভার্সন। মানুষের মনোজগতের এই শর্টকাট পন্থা আমাকে ভীষণভাবে শঙ্কিত করে।

শর্টকাট পন্থাটি যদি আমাদের ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে তেমন কোনো শঙ্কার বিষয় ছিল না; কিন্তু বিষয়টি ধীরে ধীরে আমাদের প্রাত্যহিক বাস্তব জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। এর নিশ্চিত পরিণাম হতাশা ও জীবনযুদ্ধে অসফলতা। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক বর্ষে স্টাডি ট্যুর হয়। এই ট্যুরে সাধারণত শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিষয়ে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে। এমন একদল শিক্ষার্থী আমাকে ফোন করে জানাল—তারা স্টাডি ট্যুরে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কের টিয়ার ফোর ডাটা সেন্টার পরিদর্শন করতে ইচ্ছুক। টিয়ার ফোর ডাটা সেন্টার তৈরির টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। তাই খুব সহজেই তাদেরকে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে দিতে পারলাম; কিন্তু নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ ৬০ ছাত্রের ইনফরমেশন পূরণের উদ্দেশ্যে প্রত্যেকের জন্য একটি পৃথক ফরম পূরণ করতে দিয়েছিল। ফরম পাওয়ার পর শিক্ষা সফরে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র আমাকে ফোন করে বলল, ‘স্যার, ৬০টি ফরম পূরণ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ফরম পূরণ না করে কি পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা যায়’? ফোনটা পেয়ে আমি খুবই বিরক্ত হয়েছিলাম। বিরক্তি চেপে রেখে বললাম, ‘এমন অনুরোধ করা কি আমার পক্ষে সম্ভব!’ বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনবরণ প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ করতে শিক্ষার্থীরা চাঁদা দেওয়াসহ বাড়তি খরচের জন্য স্পনসর জোগাড় করার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠিত অ্যালামনাই ছাত্রের কাছে অনুষ্ঠান আয়োজনকারীরা ছোটো ভাইয়ের দাবি নিয়ে স্পনসরের জন্য আবদার করে থাকে। এমন আবদারে সাড়া দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন প্রতিষ্ঠিত অ্যালামনাই ছাত্র টাকা দিতে সম্মত হলেন এবং বললেন—ওমুক দিন এসে টাকা নিয়ে যেও; কিন্তু নির্ধারিত দিন আয়োজনকারী শিক্ষার্থীরা ফোন করে তাকে বলল, ‘ভাইয়া টাকা বিকাশ করে পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়। আপনার কাছে যাওয়া তো বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। পরবর্তীতে বেশ মনক্ষুণ্ন হয়েই স্পনসরকারী ছাত্র বলেছিল, ‘শুধু টাকা দেওয়া তো আমার উদ্দেশ্য ছিল না, আমার অনুজ ছোটো ভাইয়েরা কেমন পড়ালেখা করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের খবরাখবর কী? সর্বোপরি তাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া—সব মিলিয়েই আমি তাদেরকে ডেকেছিলাম’। জীবনে সফলতার জন্য মনে রাখা জরুরি ‘নদী এগোয় না পিপাসার্ত এগোয়’। উত্তর হবে, অবশ্যই পিপাসার্ত। মনে রাখতে হবে প্রয়োজনটি কার? যদি আমার হয় তাহলে যেখানে গেলে আমার প্রয়োজন মিটবে আমার সেখানেই যেতে হবে। এগুলো হলো জীবন থেকে নেওয়া নব প্রজন্মের শর্টকাট চর্চার দুয়েকটি উদাহরণ। সম্প্রতি করোনায় যখন দেশ বিপর্যস্ত। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শর্টকাট অনেক পন্থাই আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম একজন সম্মানিত ব্যক্তি দুর্যোগকালীন সময়ে সহায়তার চিত্র ফুটিয়ে তুলতে কৃষকের কাঁচা ধানই কাটছেন। শর্টকাট দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তব জীবনে সবার মধ্যে এমন ব্যাপক আকারে সংক্রমিত হয়েছে যে, মানুষ কাণ্ডজ্ঞানশূন্য হয়ে ব্যাংকের লোনের টাকা তছরুপ থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা নানান ফন্দিফিকির ও কৌশল করে নিরবে নয়ছয় করছে। এর সঙ্গে যুক্ত গুটিকয়েক ব্যক্তি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে; কিন্তু সমগ্র জাতি অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। জীবনে খুব দ্রুত সাফল্য পেতে কার না মন চায়; কিন্তু সত্যিকার অর্থে সাফল্য যদি দ্রুতই পাওয়া যেত তাহলে সংসারে সব মানুষ সফল হতো। জীবনে প্রকৃত সাফল্য পেতে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। শর্টকাট রাস্তা দিয়ে সাফল্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব। পরিশেষে এটাই বলব, পরিশ্রম করতে শিখুন। ভার্চুয়াল জগতেও শর্টকাট রাস্তাতে চলা বন্ধ করুন। কারণ এটা ধীরে ধীরে আপনার মনোজগেক পরিবর্তন করবে। বাস্তব জীবনেও আপনি নিজের অজান্তেই কর্মবিমুখ হয়ে উঠবেন। শর্টকাট আপনার জীবনে সফলতার চেয়ে ক্ষতি বেশি বয়ে আনবে। পরিশ্রমের রাস্তা কঠিন হলেও সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় জীবনে সুখ আনে। নিশ্চিত জীবন গড়ে তোলে।

n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ডুয়েট, গাজীপুর