বর্ণবৈষম্য নিপাত যাক

আপডেট : ০১ জুন ২০২০, ২১:৪৫

মো. ইমরান হোসেন

বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রে আবারও ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক আন্দোলন। গত ২৫ মে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে শ্বেতাঙ্গ এক পুলিশ সদস্য কমপক্ষে পাঁচ মিনিট ধরে ঘাড় চেপে রেখে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে নিরস্ত্র এক কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিককে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে পুরো আমেরিকা।

শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্য কর্তৃক হত্যার শিকার কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের নাম জর্জ ফ্লোয়েড। ৪৬ বছর বয়সি ফ্লয়েড মিনিয়াপোলিস শহরের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য, জাল নোট আছে এমন সন্দেহে ফ্লয়েডের গাড়ি চেক করতে চাইলে পুলিশকে তিনি বাধা দেন। কিন্তু ১০ মিনিটের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তেমনটি দেখা যায়নি। সামান্য এই অভিযোগে নৃশংস কায়দায় তাকে হত্যা করে ৪৪ বছর বয়সি শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্য ডেরেক চৌভিন। এই হত্যাকাণ্ডটি কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ঘৃণাবোধ থেকেই হয়েছে বলে মনে করছেন সকলে। এমন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাই সোচ্চার হয়েছে আমেরিকার সাধারণ মানুষ।

২৫ মে, সোমবার সন্ধ্যায় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হওয়ার পর পরই ভাইরাল হয় ঐ ঘটনার ১০ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ। এমন নৃশংস ঘটনা দেখে রাস্তায় নেমে আসে মিনিয়াপোলিস শহরের হাজার হাজার মানুষ। বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগে উত্তাল হয়ে ওঠে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য। ক্রমেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে নিউ ইয়র্ক,  লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, ডেনভার, ফিনিক্স ও মেমফিসের মতো শহরে। কলোরাডো, কলম্বাস, হিউস্টন ও ওহাইওতেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। লুইসভিল ও কেন্টাকিতে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন অনেকেই। ডেট্রয়েটে গুলিতে এক যুবক নিহত, নিউ ইয়র্কে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ও আটলান্টায় পুলিশের গাড়িতে গুলির পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কারফিউ জারি করেছে প্রশাসন। কিন্তু কারফিউ মানছে না বিক্ষুব্ধরা। কারফিউ ভঙ্গ করে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। হোয়াইট হাউসের বাইরেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। সবশেষ খবর হলো, বিক্ষোভের মুখে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট চার পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। শুক্রবারে গ্রেফতার করা হয়েছে হত্যাকারী ডেরেক চৌভিনকে।

জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনায় আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের বিষয়টি আবারও বিশ্ববাসীর নজরে এসেছে। আমেরিকান পুলিশবাহিনী আরো বেশি বর্ণবাদী। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যানুসারে আমেরিকায় গত ২০১৯ সালেই ১ হাজার ১৪ জন মানুষ পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা যায় যে, আমেরিকান পুলিশবাহিনীর গুলিতে নিহত কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা শ্বেতাঙ্গদের তিন গুণ! তাহলে বোঝাই যাচ্ছে,  আমেরিকাতে বর্ণবাদ এখনো কতোটা তীব্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই একসময় শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে মিশতো না। একই রেস্তোরাঁয় কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে খাবার খেত না। শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেত না কৃষ্ণাঙ্গরা। ভোটাধিকারের বৈষম্য তো পরের বিষয়, বাসে কোনো শ্বেতাঙ্গ উঠলেও সিট ছেড়ে দিতে হতো কৃষ্ণাঙ্গদের। ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এমন এক ঘটনাই মনে দাগ কেটে যায় মার্টিন লুথার কিংয়ের। বাসে দেখতে পান, পার্কস নামে কৃষ্ণাঙ্গ এক মহিলাকে গ্রেফতার করে মার্কিন পুলিশ। পার্কসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, এক শ্বেতাঙ্গ বাসে ওঠার পর তাকে সিট ছেড়ে দেয়নি সে। এমন ঘটনা দাগ কেটে যায় মার্টিন লুথার কিংয়ের মনে। তিনি এমন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে শুরু করেন ‘সিভিল রাইটস মুভমেন্ট’। তার নেতৃত্বে অ্যালবামা অঙ্গরাজ্যে বাস সার্ভিস বর্জন করেন কৃষ্ণাঙ্গরা। কেউ নিজের গাড়িতে আর বেশিরভাগই পায়ে হেঁটে অফিস করা শুরু করেন কৃষ্ণাঙ্গরা। এভাবে অনেকদিন আন্দোলন চলার পর কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্যকে বেআইনি ঘোষণা করা হয় অ্যালবামা রাজ্যে।

যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন মার্টিন লুথার কিং। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে তিনি তার বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ ভাষণটি প্রদান করেন। চাকরিসহ সর্বক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ ভেদাভেদ বন্ধ করে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সেই ভাষণ মুগ্ধ হয়ে শুনে সেখানে উপস্থিত আড়াই লাখ মানুষ। ওয়াশিংটন থেকে লিংকন মেমোরিয়াল পর্যন্ত সেদিন ছিল জনতার ঢল। আমেরিকার এই মহান নেতার আন্দোলন বিফল হয়নি। ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আইন ও ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার আইন প্রণয়ন করে রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বৈষম্য দূরীভূত হয়। ফলে সরকারি সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার।

মার্টিন লুথার কিং আন্দোলন করে আমেরিকার রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও শ্বেতাঙ্গদের একাংশের মন থেকে এখনো কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ঘৃণাবোধ মুছে যায়নি। যার ফলে এখনো আমরা আমেরিকাতে মাঝে মাঝেই বর্ণবাদী সন্ত্রাস লক্ষ্য করি। জর্জ ফ্লয়েডের ওপর নৃশংস নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাটি তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মানুষ কেবল গায়ের রঙের কারণেই ঘৃণার শিকার হবে? এমনটি ঘটলে কি করে আমরা নিজেদের সভ্য বলতে পারি?

আমরা চাই বর্ণবৈষম্য নিপাত যাক। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, সারাবিশ্ব জুড়ে বর্ণবাদী সন্ত্রাস ও ঘৃণা দূরীভূত হোক। কেবল গায়ের রঙের কারণে আর কেউ যেন নিগৃহীত না হন।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়