প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা

আপডেট : ০১ জুন ২০২০, ২১:৪৫

ডক্টর ফাদার লিটন হিউবার্ট গমেজ

পাঁচ বছর পূর্বে ২৪ মে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে পোপ ফ্রান্সিস ‘আমাদের অভিন্ন বসতবাটি’ অর্থাত্ বিশ্বজগতের যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর ১১৬ পৃষ্ঠার একটি সর্বজনীন পত্র লিখেছেন। পত্রটির শিরোনাম ‘লাউডাটো সি’ (Laudato Si), ইংরেজিতে ‘Praise be to you, my Lord’ এবং বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে ‘তোমার প্রশংসা হোক’; যা বিশ্বের সব মানুষের প্রতি প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশীদের সুরক্ষায় জেগে ওঠার একটি আহ্বান জানাতে পারি। অন্তরে গভীরভাবে উপলব্ধি করি—আবর্জনা এখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলে অপরিচ্ছন্ন-অস্বাস্থ্যকর নর্দমা তৈরি করেছি; গাছ কেটেছি কিন্তু রোপণে অবহেলা করে পরিবেশে ভারসাম্য নষ্ট করেছি; স্বার্থপর ও অতিভোগের কারণে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ করে ফেলেছি; প্রতিনিয়ত প্রচুর পানি অপচয় করছি, খাল-নদীর জল বিষাক্ত করে ফেলেছি; এভাবে প্রকৃতি ও প্রতিবেশীদের প্রতি অনেক ক্ষতি ইতিমধ্যে করেছি। এসব স্মরণ করে অনুতপ্ত হই ও মন-পরিবর্তন করে প্রকৃতি ও প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলি।

আমাদের পরিবার হলো সৃষ্টির একটি অংশ। পরিবার যত্ন নিয়ে থাকে সৃষ্টি ও প্রকৃতির এবং পরিবার বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপকরণসমূহ প্রকৃতি সরবরাহ করে থাকে। তাই দায়িত্বশীল পরিবার গঠন, সুন্দর জীবনযাপন, স্বামী-স্ত্রীর অঙ্গীকার রক্ষা, বিপদাপন্ন আপনজনদের সেবাযত্ন করে পারিবারিক পরিবেশ সুন্দর করে তুলতে পারি। পরিবারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপ—প্রয়োজন মাফিক কেনাকাটা, পরিমিত রান্না ও অপচয় রোধ, পরিমিত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, জিনিসপত্র পুনঃব্যবহার করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহযোগিতা করতে পারি। বাড়িতে বিদ্যুত্, গ্যাস, টেলিভিশন, এসি, পানির কল, বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহারের পর বন্ধ রাখাতে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। রান্নাঘরের অবশিষ্টাংশ, পাতা-লতা ও আবর্জনাগুলো মিশ্রিত করে উত্তম সার তৈরি করা যায় এবং এসব গাছের বৃদ্ধিতে আরো ভালো সার হিসেবে সহায়তা করে।

শুধু পরিবারের মানুষের সুবিধার কথা চিন্তা করলে স্বার্থপর হয়ে উঠব; বরং বনের জীব-জন্তু, আকাশের পাখি, বাতাসে উড়ে বেড়ানো মশা-মাছি, ভূমির পোকা-মাকড় ও সরিসৃপ, নদী ও জলাভূমির মাছ, সমুদ্রের সব জীবের কল্যাণের বিষয়ও ভাবী। সৃষ্টিকর্তা এদেরও সৃষ্টি করেছেন, প্রকৃতিতে এদের একটি করে ভূমিকা দেওয়া আছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এদেরও দরকার আছে। এদের একটি যদি আমরা নিঃশেষ করে ফেলি তবে প্রকৃতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে; ফলে মানুষের কষ্ট বাড়বে। বাড়িতে তাই খালি জায়গায় গাছ রোপণ ও নির্ধারিত গাছ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব বণ্টন করে দিতে পারি।

কর্মস্থলে প্রয়োজন ছাড়া কাগজে প্রিন্ট না করা, প্রয়োজনে কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় প্রিন্ট করা এবং সুযোগ থাকলে কাগজ পুনর্ব্যবহার করতে পারি; কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য অফিস সরঞ্জামসমূহ ব্যবহারের পরে বন্ধ রাখব; শারীরিক সমস্যা ব্যতীত দ্বিতীয়, তৃতীয় তলায় এবং সকালে লিফ্ট ব্যবহারে বিরত থাকা এবং দলীয়ভাবে গাড়ি ব্যবহার করার মাধ্যমে কার্বন ব্যবহার হ্রাস করতে পারি। একটি মানবিক পরিবেশ রক্ষার জন্য কর্মস্থলে নারীদের প্রতি আচার-আচরণে শিষ্টাচার অনুসরণ, সহকর্মীদের প্রতি পারস্পরিক যত্নশীল থাকা, সৌজন্যসূচক শব্দ ব্যবহার, দলীয়করণ মনোভাব ও অযাচিত তোষামোদপ্রিয় স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

মাটি একটি জীবন্ত উপাদান। জীবন মাটি থেকে আসে এবং তাই মাটি বাঁচিয়ে রাখা উচিত। স্বতন্ত্রভাবে মোড়ানো ক্যান্ডি প্লাস্টিক ব্যবহার করে থাকে এবং প্রচুর আবর্জনা তৈরি করে যা মাটিকে নষ্ট করে ফেলে। আমরা এ মুহূর্তে প্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারছি না তাই সঠিকভাবে ব্যবহার করার দিকে গুরুত্ব দিতে পারি। আবর্জনা হিসেবে প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পলিথিন ব্যাগ একেবারেই বাদ দিতে হবে কারণ এর ক্ষতির ধরন বহুমাত্রিক এবং বাড়ছে— মাটি নষ্ট করে জমিতে ফসল উত্পাদন ক্ষমতা নষ্ট করছে, শহরে নর্দমা বের হওয়ার পথ বন্ধ করে ব্যাপক ক্ষতি করছে এবং আগুনে দিলে গ্যাস হয়ে বায়ুদূষণ করে মানবদেহের সাংঘাতিক ক্ষতি করছে। তাই পাটের তৈরি চটের ব্যাগ অথবা ভারী ও শক্ত কাপড় পুনর্ব্যবহার করে ব্যাগ তৈরি করে ব্যবহার করতে পারি।

করোনা ভাইরাস মহামারি শিখিয়েছে আমাদের আরো বেশি যত্নবান ও রক্ষণাবেক্ষণ মনোভাব প্রয়োজন। নিজের কল্যাণের কথা ভেবেই প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশীর সুরক্ষা সুসংবাদটি আপনজন ও বন্ধু বান্ধবদের জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আহ্বান। ইতিমধ্যে অনেকে নীরবে কাজ করে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেছি। পোপ মহোদয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের আবাসস্থল, পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষার্থে ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে এবং কর্মস্থলভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ মহান কিছু অর্জন সম্ভব হবে।

n লেখক :প্রভাষক, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা