কোভিড-১৯, ড্রাগ ও চিকিত্সা

আপডেট : ০২ জুন ২০২০, ২১:৫৩

কোভিড-১৯ মহামারিতে গোটা বিশ্ব স্মরণকালের এক ভয়াবহ সময় অতিক্রম করছে। মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত, কারণ এই ভয়ংকর ছোঁয়াচে ও দ্রুত বিস্তারকারী রোগটি ‘প্রাণঘাতী’ এবং এই মুহূর্তে রোগটির প্রতিরোধকারী কোনো ভ্যাক্সিন বা আক্রান্ত রোগীর চিকিত্সার জন্য কোনো কার্যকর ড্রাগ বা থেরাপি মানুষের হাতে নেই! করোনা রোগীর টেস্ট ও ‘বিশেষায়িত’ চিকিত্সা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই পর্যাপ্ত নয়—অনেক উন্নত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপে প্রায় বিপর্যস্ত!

কোভিড-১৯-এর প্রচলিত চিকিত্সা :

সাধারণত রোগের উপসর্গ প্রকাশিত হলে বাসায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঠান্ডা-কাশি-জ্বরের ওষুধ গ্রহণ এবং প্রচুর ফ্লুইড (পানি, জ্যুস) পান করাই হলো রোগটির ‘সাধারণ’ চিকিত্সা। মোটামুটি ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই কোনো বিশেষায়িত চিকিত্সা ছাড়াই রোগী ১০-১৫ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলে হাসপাতালের আইসিইউতে ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে হয়। এই অবস্থায় শরীরের ইমিউন সিস্টেম ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভালো প্রতিরোধ গড়ে তুললে ১৫-২০ দিনের মধ্যেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু রোগীর ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ বা কোনো কারণে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হলে এই ইনফেকশনটি মারাত্মক হয়ে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা হার্ট অ্যাটাকে রোগী মারা যায়।

কোভিড-১৯ মোকাবিলার মেডিক্যাল সমাধান মূলত দুটি :

১) ভ্যাকসিন বা টিকা :এটি মূলত রোগটির প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যাতে কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে আগে থেকেই একটি কার্যকর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে তার ইমিউন সিস্টেমকে প্রস্তুত করা হয়, যাতে সত্যিকারের ভাইরাস আক্রমণে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে ফুসফুস কোষকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়।

২) ড্রাগ বা থেরাপি :এটি মূলত কোভিড-১৯ রোগীর জন্য একটি চিকিত্সাব্যবস্থা (প্রতিক্রিয়ামূলক), যাতে রোগীর ওপর কোনো কার্যকর ড্রাগ প্রয়োগ করে ফুসফুস কোষে ভাইরাসটির প্রবেশ বা বংশবিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করে ভাইরাসজনিত ইনফেকশন এবং রোগের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট মারাত্মক ইনফ্লেমেশনকে প্রতিহত করা যায়। এখন কোভিড-১৯-এর একটি কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার, ট্রায়াল, উত্পাদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষে মানুষের কাছে পৌঁছাতে ন্যূনতম ১২-১৮ মাস সময় লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

‘সম্ভাবনাময়’ ড্রাগ :বর্তমানে সারা বিশ্বে ১৫০টিরও বেশি সম্ভাব্য ড্রাগ নিয়ে গবেষণা চলছে, যার মধ্যে নিম্নোক্ত ড্রাগগুলো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘সম্ভাবনাময়’ ড্রাগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে :

১) রেমডেসিভির :যুক্তরাষ্ট্রের ‘জিলেড’ কোম্পানির প্রস্তুতকৃত এই পরীক্ষামূলক ‘অ্যান্টিভাইরাল’ ড্রাগটি এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ড্রাগটি করোনা ভাইরাসের আরএনএ (RNA)কে টার্গেট করে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধিকে বন্ধ করতে সমর্থ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২) ক্লোরকুইন/হাইড্রোক্সিক্লোরকুইন :এই ম্যালেরিয়া ড্রাগ দুটির ‘অ্যান্টিভাইরাল’ ও ‘ইমিউন সিস্টেম রিলাক্সিং’—দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই রয়েছে, যা করোনা ভাইরাসজনিত ইনফেকশন এবং পরোক্ষ ইনফ্লেমেশন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

৩) লোপিনাভির-রিটোনাভির :এই ‘অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল’ HIV ড্রাগ দুটিও কোভিড-১৯ চিকিত্সায় ‘সম্ভাবনাময়’ ড্রাগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মূলত ল্যাবরেটরিতে পাওয়া প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে।

৪) ফ্যাভিপিরাভির (অ্যাভিগ্যান) :জাপানের ‘ফুজিফিল্ম’-এর এই অ্যান্টিভাইরাল ‘ফ্লু’ ড্রাগ করোনা ভাইরাস ইনফেকশনের প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

৫) ইমিউন সিস্টেম রিলাক্সিং ড্রাগ/পরোক্ষ থেরাপি:এই ড্রাগগুলো করোনা ভাইরাসজনিত শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও পরোক্ষ ইনফ্লেমেশন প্রতিরোধে ‘কার্যকর’ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে :

মোট কথা, কোভিড-১৯ রোগীর চিকিত্সায় প্রস্তাবিত ‘সম্ভাবনাময়’ ড্রাগগুলোর প্রাথমিক বা সীমিত ট্রায়ালের ফলাফল এখন পর্যন্ত যথেষ্ট ‘সন্তোষজনক’ বা ‘সিদ্ধান্তমূলক’ নয়; আরো ব্যাপক ট্রায়ালভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আশার কথা হলো, আন্তর্জাতিক ‘সলিডারিটি’ ট্রায়াল, যুক্তরাজ্যের বৃহত্ ‘রিকভারি’ ট্রায়াল, চীন, জাপান, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত ব্যাপক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল আগামী তিন-চার মাসের মধ্যেই প্রকাশিত হবে। এছাড়া ব্লাড-প্লাজমা ও অ্যান্টিবডি ড্রাগের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলও এ বছরের শেষ নাগাদ হাতে আসবে।

n লেখক :কানাডা প্রবাসী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষক