বলা হইয়া থাকে, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। আর ভালো স্বাস্থ্যের নেপথ্যে রহিয়াছে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস এবং আধুনিক চিকিত্সার সুযোগ-সুবিধা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ১৯৭১ সালে দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৭ বত্সর। বর্তমানে আমাদের গড় আয়ু ৭২ বত্সরের অধিক। তাহার কারণ ঐ চিকিত্সার পরিকাঠামোর অভাবিত উন্নতিসাধন। অনেকেই হয়তো বিদ্যমান অবকাঠামোর ভিতরে সমালোচনার অনেক রসদ খুঁজিয়া পাইবেন। কিন্তু আমরা যদি দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক স্বাস্থ্যচিত্রের দিকে তাকাই, তাহা হইলে দেখিতে পাইব, সেইখানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত উজ্জ্বল। উন্নতি তো আলাদিনের চেরাগ দিয়া রাতারাতি হয় না। অতীতের অতি অনুন্নত ধাপগুলি পার করিয়া টেকসই উন্নতির সোপানে পা রাখা খুব সহজ কর্ম নহে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানের র্যাংকিং প্রকাশ করিয়া থাকে। সেইখানে সর্বশেষ র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপরে রহিয়াছে কেবল শ্রীলঙ্কা। তাহাদের অবস্থান ৭৬তম। অন্যদিকে ভারত ১১২ এবং পাকিস্তান রহিয়াছে ১২২তম অবস্থানে। নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তানের অবস্থান আরো অনেক পরে।
এখন প্রশ্ন হইল, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা এত ভালো হইলে এই দেশের মানুষ কেন বিদেশে চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করিতে যায়? সত্যিকার অর্থে যাহারা বহু বত্সরের অভ্যাসবশত বিদেশে চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করিতে যায়, তাহাদের অনেকেই জানে না, দেশের বর্তমান চিকিত্সা অবকাঠামো কেবল বেসিক চিকিত্সার জন্য নহে, উন্নত চিকিত্সার ক্ষেত্রেও তাত্পর্যপূর্ণ উন্নতি সাধন করিয়াছে। স্বাস্থ্য খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমে এখন বাংলাদেশেই সর্বাধুনিক প্রযুক্তির উন্নত মানের চিকিত্সা পাওয়া যাইতেছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি ও গবেষণা কাজে লাগাইবার লক্ষ্যে দক্ষ চিকিত্সা পেশাজীবী সৃষ্টি করিতে এবং চিকিত্সক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব পূরণ করিতে বিগত এক দশকে দেশে তিনটি নূতন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১০৭টি সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং একটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হইয়াছে। চিকিত্সকদের জন্য উচ্চশিক্ষার আসন বৃদ্ধি, নূতন কোর্স চালু, নার্সিং বিষয়ে পিএইচডি ও মাস্টার্স প্রশিক্ষণ, বিএসসি নার্সিংয়ের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্স চালুসহ দক্ষ জনবল তৈরিতে নেওয়া হইয়াছে বিস্ময়কর সব উদ্যোগ। তাহা ছাড়া, বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোগীদের উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হইতেছে বিভিন্ন হাসপাতালে। অত্যাধুনিক মলিকুলার ল্যাবের মাধ্যমে সঠিকভাবে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হইতেছে। অনেক হাসপাতালেই ওয়ান-স্টপ-সার্ভিসের মাধ্যমে রোগীদের চিকিত্সাসেবা দেওয়া হইতেছে।
সম্প্রতি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি সামলাইতে জরুরি ভিত্তিতে ২ হাজার চিকিত্সক ও ৫ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। প্রতিটি জেলায় আইসিইউ ও হাসপাতালে শয্যা বৃৃদ্ধির কাজও শুরু হইয়াছে। জাতীয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে পাঁচ বত্সর মেয়াদি ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি’ ২০১৭-২২-এর বাস্তবায়ন শুরু হইয়াছে। সুতরাং ইহা বলাই যায়, চিকিত্সাসেবা প্রদানে বাংলাদেশ নূতন দিগন্তের উন্মোচন করিয়াছে।
