ড. আতিউর রহমান
এমন এক সময়ে এবারের বাজেট তৈরি করতে হচ্ছে তখন একই সঙ্গে সারা বিশ্বের সমাজ ও অর্থনীতি থমকে আছে। কয়েক দশক ধরে বিশ্ব জুড়ে যে আর্থসামাজিক সংযোগ গড়ে উঠেছিল তা এই করোনা সংকটের কারণে বন্ধ হবার পথে। যে প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসন ঘটার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনের মান বেশ খানিকটা বেড়েছিল তা যেন ধুয়ে-মুছে শেষ হবার পথে। ফের দারিদ্র্য বাড়তে শুরু করেছে। অভাব-অনটন ও বুভুক্ষা হুহু করে বাড়ছে। জীবন বাঁচাব না অর্থনীতি বাঁচাব—এই টানাপোড়েনে প্রায় সব দেশের নীতিনির্ধারকরাই প্রাণান্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত উপযুক্ত ওষুধ কিংবা টিকা না পাওয়া যাচ্ছে ততদিন এই দ্বিধা কাটবে বলে মনে হয় না। শুধু নীতিনির্ধারকরা কেন, প্রতিটি মানুষই ভয়ে কুঁকড়ে আছেন। স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা ভেবে কম আয়ের মানুষসহ সরবরাহ চেইনের সঙ্গে জড়িত অংশীজনেরা ঘরের বাইরে বের হতে দ্বিধান্বিত। যখনই বের হবার চেষ্টা করছেন তখনই করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা—উভয়ই বাড়ছে। তাই ভয়ও বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরবরাহে। অন্যদিকে মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না বলে সার্ভিস খাতে চাহিদা কমে গেছে। ফলে দারুণ প্রভাব পড়ছে চাহিদার ওপর। আর সে কারণেই হয়তো সরকার লগডাউন তুলে নিচ্ছে। তবে ধীরে ধীরে এবং সমন্বিত উপায়ে তা করা গেলে ভালো হতো। তাছাড়া, পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্সের বৈদেশিক চাহিদা তো বিশ্ব জুড়ে মন্দার কারণে পড়ন্ত। সে কারণেই আইএমএফ বলছে, বিশ্ব প্রবৃদ্ধির হার আগের নেতিবাচক তিন শতাংশ থেকে আরো পড়ে যেতে পারে। যদিও মূলত কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সচলতার কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি গড়পড়তা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ থেকে খানিকটা ভালোই হবে বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও স্বাস্থ্যসংকট যদি আর দীর্ঘ ও তীব্র হয় তাহলে এই অর্জনও ধরে রাখা মুশকিল হবে। অথচ কয়েক মাস আগেও বলা হচ্ছিল বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে ভালো প্রবৃদ্ধির দেশ। এক ধাক্কায় যেন আমাদের বিগত কয়েক দশকের অর্জন ধুলোয় মিশে যাবার পথে। এই সেদিনও আমরা বলছিলাম আমাদের দারিদ্র্যের হার বিশ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এই কয় মাসেই তা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশে উঠে এসেছে। এমনই এক দারুণ চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপটে আসছে আগামী অর্থবছরের বাজেট। কী করে যে ‘কাপড় অনুযায়ী কোট’ কাটবেন অর্থমন্ত্রী তাই ভাবছি।
নিঃসন্দেহে, এবারের বাজেটটি হতে হবে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার। আগামী অন্তত এক বছর ধরে ইতিমধ্যেই আমাদের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়ে গেছে তা পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করে যেতে হবে। তবে আগে মানুষকে যে বাঁচাতে হবে? মহামারি থেকে যেমন বাঁচাতে হবে, তেমনি ক্ষুধার জ্বালা থেকেও তাদের মুক্ত রাখতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা স্বাস্থ্য বাজেটের দিকে নজর দেই নি। শ্রীলঙ্কা যেখানে জিডিপির ৪ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে, আমরা সেখানে খরচ করি ১ শতাংশেরও কম। এবারই তাই এই বাজেটে দ্বিগুণেরও বেশি করতে হবে। ধীরে ধীরে বাড়িয়ে আগামী দুই-তিন বছরে তাকে জিডিপির ৪ শতাংশে উন্নীত করতেই হবে। আমাদের প্রতিটি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় সরকারি হাসপাতালগুলোকে আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরিত করতে হবে। তবে এ বছর করোনা শনাক্ত করা, তার সন্ধান করা, আক্রান্তদের চিকিত্সা করার জন্য যা লাগে সেই পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এসব হাসপাতালে আইসিইউ সুযোগ গড়ে তোলা, কেন্দ্রীয় অক্সিজেন লাইন বসানো, প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা। ব্যক্তি খাতের হাসপাতালের এক-তৃতীয়াংশ বেড অধিগ্রহণ করে যাবতীয় অবকাঠামো ও সুযোগ বৃদ্ধির খরচও সরকারকে বহনকরার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞ হাসপাতালগুলোকে আরো প্রণোদনা দিয়ে সারাদেশের ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ, সমন্বয় ও নেতৃত্ব দেবার মতো করে গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে কারিগরি সহায়তা নেবার উদ্যোগও নিতে হবে। মানুষকে বাঁচাতে হলে তার খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। আগের গরিব এবং নতুন গরিবদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য প্রচলিত সামাজিক কর্মসূচির পাশাপাশি নগদ সহায়তা প্রদানের কর্মসূচিকে আরো প্রসারিত করতে হবে। কোটির বেশি নতুন গরিবকে অন্তত তিন মাস ধরে নগদ সহায়তা দেবার মতো অর্থ সংশোধিত বাজেটে রাখতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত নগদ সহায়তা পৌঁছানোর যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে সেই ধারা আরো প্রসারিত ও ক্ষিপ্র করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা বাজেটেও বরাদ্দ বিপুল হারে বাড়াতে হবে। বর্তমান তা জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ (যার ৩৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন)। শুধু গরিবদের সুরক্ষার জন্যই এই বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ৩ শতাংশের মতো করা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নিদেনপক্ষে তা ২ শতাংশের বেশি করতেই হবে। বিশেষ করে শহরের দরিদ্রজনদের জন্য তেমন কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেই। স্থানীয় সরকার, এনজিও ও স্থানীয় প্রশাসন মিলে নগরের দরিদ্রদের জন্য উপযুক্ত সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। সেজন্যও এখাতে বাড়তি বাজেট বরাদ্দ দেবার কোনো বিকল্প নেই।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের স্বদেশী অর্থনীতির ওপর বেশি করে জোর দিতেই হবে। আমাদের অর্থনীতির রক্ষাকবজ কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখা গেলে এই সংকট মোকাবিলা অনেকটাই সহজ হবে। তাই কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে বাজেট বাড়াতে হবে। ২০১৩ সালেও কৃষি খাতে বাজেটের ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই বরাদ্দ ২০১৯ সালে কমে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। এ বাজেটে কৃষির বরাদ্দ ১০ শতাংশের নীচে যেন না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আধুনিক কৃষির জন্য বাড়তি সমর্থন বিশেষ করে অধিকতর যান্ত্রিককরণের জন্য এই বাজেট বাড়াতেই হবে। কৃষির সরবরাহ চেইন পুনরুদ্ধার এবং ই-কমার্স সুযোগ বাড়ানো, সবজি ও ফলমূল প্রক্রিয়াজাত করা এবং নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার জন্য এই বাড়তি বাজেট অপরিহার্য।
আনুষ্ঠানিক খাতের মানুষগুলোকে নগদ সহায়তার পাশাপাশি তাদের উদ্যোগগুলো সচল রাখতে দ্রুতই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে নেমে পড়তে হবে। এই সংকট দীর্ঘ হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাগুলো একেবারে বসে যাবে। এসএমই খাতে যে প্রণোদনা ব্যাংকগুলোকে দিতে বলা হয়েছে তার পুরোটায় পুনঃ অর্থায়ন করতে হবে। পারলে সুদ ভর্তুকি আরো এক-দুই শতাংশ বাড়ানো হোক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শূন্যসুদেই এই অর্থ ব্যাংকগুলোকে দিতে পারে। ব্যাংক চাইলে এমএফআইগুলোর সঙ্গে সংযোগ কর্মসূচি চালু করে এই অর্থ নয়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সরবরাহ করতে পারে। এদের ট্রেড লাইসেন্স নেই, টিন নেই, ক্যাশফ্লো নেই। তাই ব্যাংক ঝুঁকি নিতে চাইবে না। ঝুঁকি কমাতে তাই পুনঃ অর্থায়ন ও সংযোগ কর্মসূচি চালু করা খুবই জরুরি। পাশাপাশি, যত দ্রুত ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করা যাবে তত তাড়াতাড়ি ব্যাংকগুলো এমএসএমই মুখো হবে। তাই এবারের বাজেটে এই জন্য বরাদ্দ থাকা উচিত। এই খুদে উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে স্থানীয় পর্যায়ের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা সহজতর হবে।
আমাদের ম্যাক্রো অর্থনীতি এখনো বেশ সচল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ভালো। বিদেশি দায় শোধের রেকর্ড চমত্কার। দেশীয় ভোগ ও চাহিদা সমুন্নত রাখা গেলে সার্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। আর সে কারণেই আমাদের উন্নয়ন ও আর্থিক সহযোগীদের কাছে থেকে আপত্কালীন ও মধ্যমেয়াদি সহায়তা সংগ্রহে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। হয়তো রাজস্বব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের উন্নয়নের মতো কিছু সংস্কারের কথা তারা বলতে পারে। এমনিতেই এসব সংস্কারে আমাদের হাত দিতেই হবে। তাই এসব সংস্কার করার অঙ্গীকার করে অন্তত ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশি সহায়তা সংগ্রহ খুবই সম্ভব। একই সঙ্গে সম্ভব সামর্থ্যবান প্রবাসীদের কাছে অনলাইন ট্রেজারি, প্রবাসী আয় বন্ডসহ নানা ধরনের সঞ্চয়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা। বাংলাদেশ ব্যাংক এ কাজ খানিটা শুরু করেছে। এখন দরকার এর ব্যাপ্তি ও গতি বাড়ানোর। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কয়েকটি দ্রুত বাস্তবায়ন করে নানামুখী প্রণোদনা দিয়ে কাজে নেমে পড়ার সময় কিন্তু বয়ে যাচ্ছে। চীন থেকে সরে আসা জাপান ও মার্কিন কোম্পানির বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনার জন্য দ্রুত অর্থনৈতিক কূটনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে।
তবে শুধু বাজেট বরাদ্দ ও নীতি সহায়তা দিলেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। প্রণোদনাসহ আসন্ন বাজেটকে গুণমানের বাস্তবায়ন, উপযুক্ত প্রকল্প বাছাই, অপ্রয়োজনীয় সরকারের খরচ কমানো এবং সংকটাপন্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কর্মসূচিগুলো দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কার্যকর করাই হবে এসময়ের সবচেয়ে বড়ো দাবি। মনে রাখা চাই, বাজেট শুধু অংকের মারপ্যাঁচ না। এতে জনগণের প্রতি সরকারের গভীর দরদ ও অঙ্গীকার প্রতিফলনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
n লেখক :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
