ড. এম এ মাননান
নামের কী জৌলুস! নোভেল করোনা। কোভিড-১৯। তবে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সে তার আপন ‘দ্যুতি’ ছড়াচ্ছে কারো ডাকা নামের তোয়াক্কা না করেই। দ্যুতি না বলে সুনামি বলাই বোধ হয় বেশি যুক্তিযুক্ত। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত, মরু থেকে সমতল, কোথায় নেই তার দাপট। অদৃশ্য শিং উঁচিয়ে হানা দিয়েছে ২১৩টি দেশ-অঞ্চলে। লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে জনজীবন। তাকাচ্ছে না কারো দিকে, ধনী-গরিবনির্বিশেষে সব দেশকে করে দিচ্ছে নাস্তানাবুদ। ফুসফুসে হানা দিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে সাদাকালো সব মানুষের দেহে। তিন-চার দিনেই নিঃশেষ করে দিচ্ছে মানবদেহ ঝটিতে। বারবার পরিবর্তন করছে আচরণ যেন ধরতেই না পারে কেউ। জিনোম সিকোয়েন্স পর্যবেক্ষণে এমনটিই ধরা পড়েছে বাংলাদেশের চৌকস গবেষকদের চোখে। ধরা দিচ্ছে না মানুষের হাতে। ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এ-দেহে সে-দেহে। একেবারে নাকাল করে ছাড়ছে মানবজাতিকে। বাঘা বাঘা অর্থনীতির দেশেও অবিশ্বাস্য মৃৃত্যুর মিছিল। লাখ ছাড়িয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে কোনো কোনো দেশে। কোটির ঘরের দিকে দৌড়াচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যা। এমনটি দেখেনি কখনো বিশ্ব স্মরণাতীত কালে।
অর্থনীতির চমক, সামরিক ব্যয়ের বাহাদুরি, ঠান্ডাযুদ্ধ-কৌশলে অগ্রগামিতা, কূটনীতি-কূটচালের শ্রেষ্ঠত্ব, কোনো কিছুই থামাতে পারেনি চোখেও দেখা যায় না এমন একটি বস্তুকে। নাম দিয়েছে ওরাই তার—করোনা ভাইরাস। প্রথমদিকে পাত্তা না দেওয়া ভাইরাসটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে চীনের উহান থেকে যাত্রা করে চীনকে অনেকটা লন্ডভন্ড করে দিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে সব মহাদেশে, চির বরফের দেশ অ্যান্টার্কটিকা বাদ রেখে। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে কত বড়ো দুর্বলতা লুকিয়ে আছে সব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে কত বড়ো অন্তঃসারশূন্যতা ঘাপটি মেরে বসে আছে শিক্ষাব্যবস্থায়। অনাবৃত করে দিয়েছে সমাজব্যবস্থার মাটিচাপা দেওয়া জরাজীর্ণতা আর প্রবৃদ্ধির পেছনের চোরাবালিতে মুখ ঢেকে রাখা বিশাল গর্ত। খুলে দিয়েছে সমাজচালকদের নেকাব। উন্মোচন করে দিয়েছে অমানবিক সমাজের ভগ্নচেহারা। উড়িয়ে দিয়েছে সুশাসনের ঘোমটা। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কোয়ার্টার পার না হতেই বিশ্বব্যবস্থার বোরকা খুলে দিয়ে করোনা বুঝিয়ে দিল, বিশ্ব তুমি অনেক নাজুক, নাজুকতার ব্যাপকতা তুমি বুঝতে চাওনি, বিজ্ঞজনদের কথা তুমি শুনতে চাওনি, বাহুবলে কিংবা কথার ছলে তুমি জয় করতে চেয়েছ সবকিছু, ভস্ম উড়িয়ে দেখতে চাওনি তলায় কী লুকিয়ে আছে। তুমি আজকের কথা ভেবেছ, কালকের কথা তোমার মাথায় আসেনি। পরশু দিনের কথা তো তুমি চিন্তার গণ্ডিতেই স্থান দাওনি, যদিও তোমার কাছে পরিসংখ্যান দিয়ে, গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিজ্ঞজনেরা বোঝাতে চেয়েছিল কী রকম ফাঁপা তোমার সব সিস্টেম, নীতিবিধি আর কর্মকাণ্ড। তুমি শুধু ওপরটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চেয়েছ, ভেতরটা নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাওনি। এরই মধ্যে তোমার ভেতরটা যে একেবারেই ফুটো হয়ে গিয়েছে! বুঝতে কি পারো দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে আসছে বিনাশবাহিনী? শুনতে কি পাও সর্বনাশার আগমনিসংকেত? আমার হাত ধরেই আসবে অনেক কিছু, যা তোমরা ভাবতেও পারবে না এখন। অপেক্ষা করো আরো কিছু দিন। আমি পুরাণকাহিনির রক্তবীজের বংশ। আমি সর্ববিনাশী। ছাড়ব না তোমাদের কাউকেই। কেনই-বা ছাড়ব? তোমরা কী করেছ ওদের, যারা নির্বিচারে পাহাড় কেটেছে, বনভূমি উজাড় করে দিয়েছে, অক্সিজেনের যাত্রাপথ রুদ্ধ করে দিয়ে কার্বনের নরকমুখ উন্মুুক্ত করে দিয়েছে, নদী-সাগরে ভাগাড় বানিয়ে আর নির্বিচারে বর্জ্য ছেড়ে দিয়ে তাদের প্রকৃতিগত আচরণের ওপর হামলা করেছে, পানির আধারগুলো দখল-ভরাট করে মেরে ফেলে দিয়ে পানিশূন্য করে দিয়েছে, নদনদীর মৃত্যু ঘটিয়েছে, আর প্রকৃতিবিরুদ্ধতার প্রতিযোগিতায় নেমে ধরিত্রীর বুকে আস্ফাালন করছে।
চোখে দেখছ না বলে আমার মতো ভাইরাসকে হালকাভাবে নিয়ো না। আমি তোমাদের ছাড়ব না, ছাড়ার জন্য আমি আসিনি। এরই মধ্যেই প্রচণ্ড অহংকারী আমেরিকায় লক্ষাধিক লোকের মৃত্যুর মিছিলের আয়োজন করে দিয়েছি, আড়াই কোটি লোককে চাকরিচ্যুত করে বেকার বানিয়ে ছেড়েছি। কল্যাণরাষ্ট্র দাবি করলেও বিশ্ব জুড়ে অকল্যাণকামী সারা ইউরোপকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছি। বেসামাল করে দিয়েছি ক্ষমতাধরদের। ইতালির হাড়মজ্জা এক করে দিয়েছি। স্পেনকে ফতুর করে ফ্রান্সকে প্রচণ্ড আকালে ফেলে দিয়ে তোমাদের চোখে অতিসুন্দরী প্যারিসকে ছিনতাইকারী আর ডাকাতদের হাতে তুলে দিয়েছি আর আইফেল টাওয়ারের ভাঁজেখাঁজে আমার বংশধরদের বসতি বানিয়ে দিয়েছি। আমি ছাড়ছি না কাউকেই যতই না সে বাগাড়ম্বর করুক। নিশ্চয়ই দেখেছ তোমরা, সৌদি আরবের বুকে কারফিউ বসিয়ে দিয়ে ইয়েমেনে নির্বিচার হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি। আশপাশের দেশগুলোকেও শান্তিতে থাকতে দিচ্ছি না, দেব না। ইউরোপ-আমেরিকা তছনছ করে দিয়ে এখন ছুটছি আফ্রিকা মহাদেশের দিকে। ব্রাজিলকে ইতিমধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছি, তোমরা পৃথিবীর ফুসফুস আমাজনের বন কেটে আর আগুনে জ্বালিয়ে দিয়ে শিল্পায়নের যে পাঁয়তারা করছো তার শাস্তি হিসেবে শুধু গতকাল পর্যন্ত হাজার পঞ্চাশেক নাগরিকের ফুসফুস ঝাঁজরা করে দিয়েছি, আরো বাকি আছে অনেকে। ক্ষতবিক্ষত হবে আরো অনেক ফুসফুস। ধরিত্রীর ফুসফুসে আঘাত করে তোমাদের ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখবে, তেমনটি আশা করা দুরাশা মাত্র। সব দিকেই খেয়াল আমার। খেয়াল আছে বলেই সব দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি মহা আক্রোশে। মনের গহিনে আমার একটু আনন্দও আছে বটে, তাণ্ডবের আনন্দ, মারার আনন্দ, তোমাদের বিধ্বস্ত ভবিষ্যত্ দিব্যচোখে দেখার আনন্দ।
আমাকে মহামারি বললে দুঃখ পাই। মহান তো নই-ই, মারামারিতেও নেই। তবে সত্য কথাটা বলি, ‘মারি’ বটে, কিন্তু ‘মহা’ হয়ে নয়, মারি ঝটকা হয়ে। তাই বলতে পারো আমি ঝটকামারি। একসময় তো চলেই যাব। কারণ আমার পূর্বসূরিরা যখন আদিকাল থেকেই এ গ্রহটিতে হানা দিয়েছে, তখন থেকেই তারা চিরকাল এখানে বাস করেনি। তোমাদের মতো মানুষদের সঙ্গে আমার পূর্বসূরিরা একসঙ্গে বসবাস করতে চায়নি, আমিও চাইব না। তবে আসব, যখনই হুকুম পাব তখনই আসব। তোমরা কি মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সেই আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে তোমাদের প্রমাণ করতে পেরেছ? তোমরা সে যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছ ইবলিসের তেলেসমাতির মোহে ডুবে গিয়ে। সে-ই তো এখন তোমাদেরকে চালায়, সে যেমনি চালাতে চায় তোমরা তেমনিই পুতুলের মতো চলতে চাও। অথচ তাকে সৃষ্টিকর্তা ঘোষণা করেছেন মানুষের প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে। আর তোমরা তাকে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছ (ব্যতিক্রম তো আছেই; তবে আমি খালিচোখে দেখতে না-পাওয়া অতিক্ষুদ্র ভাইরাস, আমি ব্যতিক্রম নিয়ে মাথা ঘামাই না; ব্যতিক্রম মানেই সংখ্যালঘিষ্ঠ; এরা চিরকালই দুর্বল-ভীতু, সহজে মুখ ফুটে রা করে না)। ইবলিশকে বন্ধু বানাওনি এমন বিতর্কে এসো না। তার সঙ্গে তোমাদের বন্ধুত্বের হাজারো প্রমাণ আর উদাহরণ আমি দিতে পারি। তবে তার প্রয়োজন মনে করি না। শুধু তোমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য বলি : তোমরা কি তোমাদের এ গ্রহটিকে প্রতিদিন লাঞ্ছিত করছ না? প্রতি পলে দেশে-দেশে অঞ্চলে-অঞ্চলে মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করছ না? একটু ছুতাতেই হাজারো-লাখো নিরীহ মানুষকে যুদ্ধের ছলে হত্যা করছো না? ইচ্ছাকৃতভাবে জাতিতে জাতিতে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিচ্ছ না?
আমি এসেছি বলে বাংলাদেশেও ত্রাহি অবস্থা। এ অবস্থা দেখে তোমাদের দয়ালু সরকার দুস্থদের জন্য ত্রাণ দিচ্ছে। আর সে ত্রাণের মাল কি তোমরাই লুট করে নিয়ে যাচ্ছ না গ্রামেগঞ্জে সর্বত্র? অথচ পরিচয় দিচ্ছ জনপ্রতিনিধি। লজ্জা লাগে না তোমাদের? আমার মাত্র তিন মাসের রাজত্বকালেই দেখলাম শখানেক নেতা কর্মী জেলে গিয়েছে ত্রাণ লুটের অপরাধে। শিক্ষিত নাম ধারণ করে কেন এসব করে নিজকে সমাজে ন্যাংটো করে দিচ্ছ? আমি তো দেখলাম, তোমাদের এত ঘৃণ্য অপরাধের পরও তোমাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা তোমাদের ঘৃণা করার পরিবর্তে প্রশ্রয় দিচ্ছে; লজ্জার মাথা তো তারাও খেয়েছে। তোমরা এত বড়ো অপরাধী, ক্ষমা করব কেন আমি?
রক্তচক্ষু করোনার হুংকারে আতঙ্কিত ফজর আলীর স্বপ্নভঙ্গ হলো। ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। শরীরটা কি একটু গরম লাগছে বিখ্যাত ব্যবসায়-গ্রুপের মালিক ফজর আলীর? মাথা ঝিমঝিম করছে? নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে? নাহ্! সবই স্বপ্নের ঘোর।
n লেখক : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
