রোটারিতে প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর

আপডেট : ০৪ জুন ২০২০, ২১:২৮

বীনা আহমেদ

১৯০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আমেরিকান আইনজীবী পল হ্যারিস শিকাগোর একটি ছোটো অফিসে তিন বন্ধুকে তার সঙ্গে আড্ডায় ডেকেছিলেন। এ আড্ডা থেকেই বিশ্বের প্রথম পরিষেবা সংস্থা রোটারি ইন্টারন্যাশনালের জন্ম হয়েছিল। ১১৫ বছর পরে সেই রোটারির সদস্য বেড়েছে ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি। ৩৫ হাজার ক্লাব বর্তমানে প্রসারিত হয়েছে ১৯০টি দেশে।

রোটারি ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে এসেছিল। দ্বিতীয় ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হতে সময় লেগেছিল ১৪ বছর। মূলত বাংলাদেশ সার্বভৌম জাতি হওয়ার পরে রোটারি এদেশে আসল গতি পেয়েছিল। ১৯৭১ সালে মাত্র সাতটি ক্লাব থেকে ধীরে ধীরে বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি জেলায় ৩৯১ রোটারি ক্লাব রয়েছে, যেগুলোর মোট সদস্য সাড়ে ১০ হাজারেরও বেশি। বাংলাদেশি রোটারিয়ানরা মত্স্য, অগভীর নলকূপ, বৃক্ষরোপণ, হাসপাতাল সম্প্রসারণসহ অনেক পরিষেবা প্রকল্প পরিচালনা করেছেন। তবে রোটারির ইতিহাসে সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো পোলিও নির্মূলে নিরলস লড়াই। রোটারি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশকে পোলিও ভ্যাকসিন এবং অন্যান্য রসদ আকারে ১২৫ কোটি টাকা সরবরাহ করেছিল। সরকার, ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ, সিডিসি এবং রোটারির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত হয়েছে।

গত ১১৫ বছরে রোটারির সদস্য বিশ্ব জুড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে রোটারিয়ানদের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী সদস্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। যুক্তরাষ্ট্রে রোটারি ডিস্ট্রিক্টগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডিস্ট্রিক্ট ৭২৩০, যা নিউ ইয়র্ক সিটি অঞ্চলের পাশাপাশি ওয়েচেস্টার কাউন্টি এবং বারমুডা দ্বীপরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। ডিস্ট্রিক্ট ৭২৩০-এর সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বিশেষ সংযোগ আছে। আর তা হচ্ছে—রোটারির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক জন বাংলাদেশি আমেরিকান উপমহাদেশের বাইরের একটি রোটারি জেলার গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। জাতিসংঘের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্মকর্তা মাহবুব আহমেদ ১ জুলাই ২০১৯ তারিখে এক বছরের মেয়াদে এ জেলার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন এবং ১৯৮২ সালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক বেসামরিক কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হন। অবসর গ্রহণের পরে রোটারিতে যোগ দেন তিনি। ২০১৬ সালে তিনি ইয়োনকার্স-ইস্ট ইয়োনকার্স ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং রোটারির জেলা গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি জেলার প্রযুক্তি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রোটারির দায়িত্ব পেয়ে সেখানে প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহারকে উত্সাহ দেওয়ার, কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার এবং সদস্যপদ বাড়ানোর কৃতিত্ব দেখান।

তবে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান, উত্সাহ ও সহযোগিতা দিয়ে রোটারিয়ান বীনা আহমেদের মাধ্যমে এই ডিস্ট্রিক্টে একটি নতুন ক্লাব প্রতিষ্ঠা। নতুন ক্লাবটি দুটি ক্ষেত্রে অনন্য—এটি জেলার প্রথম ই-ক্লাব; যেটির সদস্যরা সম্পূর্ণ অনলাইনে মিলিত হন এবং এটি সম্পূর্ণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমন্বয়ে গঠিত। এরা সবাই অত্যন্ত অভিজ্ঞ, পেশাদার এবং রোটারির ভুবনে একেবারেই নতুন। ই-ক্লাবের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার বাসিন্দা। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও এক জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

১৯৯৯-এর গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে রোটারি ই-ক্লাব অফ হেরিটেজ নিউ ইয়র্ক স্থানীয়ভাবে এবং বাংলাদেশে উভয় দেশেই নানা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। এর প্রথম বৃহত্ প্রকল্পটি রোটারি ফাউন্ডেশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে; সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য ৩৪ হাজার ডলারের একটি প্রকল্প। এই ক্লাব চাঁদপুরে একটি বালিকা অনাথ আশ্রমকে সহায়তা দিয়েছে। ক্লাবটি যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর জন্য পিপিই সরবরাহের লক্ষ্যে তহবিল সংগ্রহ করেছে, স্থানীয় বিদ্যালয়ের অভাবী শিশুদের পরিবারকে থ্যাঙ্কসগিভিং উপহারস্বরূপ টার্কি সরবরাহ করেছে।

এবং এই মাসে ক্লাবটি কোভিড-১৯ দ্বারা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ১৪ বাংলাদেশি পরিবারকে এক মাসের জন্য মুদিপণ্য সরবরাহের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে। আগামী দিনগুলোতে আরো পরিবারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে রোটারির ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর মাহবুব রোটারি ফাউন্ডেশন থেকে জরুরিভিত্তিতে ২৫ হাজার ডলারের তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। জেলা থেকে তিনি আরো তহবিল সংগ্রহ করেন এবং আগের অব্যবহূত তহবিল এই সংকটকালে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। করোনা সংকটে ব্যয় করার জন্য ২৪টি ক্লাবের জন্য ৫৬ হাজার ৫০০ ডলার তহবিল গঠনে সক্ষম হন।

রোটারির ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর মাহবুবের উদ্যোগে মূলত রোটারিয়ানদের সরাসরি বৈঠকের রীতি থেকে সরে গিয়ে অনলাইন বৈঠকের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি এখন অদূর ভবিষ্যতে নতুন ও প্রতিষ্ঠিত প্রথা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। তার উত্সাহ এবং সহায়তায় প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে বেশির ভাগ ক্লাব এখন নতুন ফরম্যাটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং অনেক ক্লাব অনলাইনে বৈঠকের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

n লেখক :রোটারির প্রথম ই-ক্লাবের উদ্যোক্তা