সুরক্ষার সরঞ্জামেই রহিয়াছে অরক্ষার বীজ!

আপডেট : ০৫ জুন ২০২০, ২১:৩৩

বাংলাদেশে কোন পেশাজীবীদের মধ্যে কোভিডে আক্রান্তের সংখ্যা সকলের চাইতে অধিক? যাহারা একটুখানি খোঁজখবর রাখেন, তাহারা যে-কেহ খুব সহজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিবেন। প্রশ্ন হইল, চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কেন এত অধিক সংখ্যায় করোনায় আক্রান্ত হইতেছেন? ইহার উত্তরটি কিন্তু দুঃখজনক।

মনে হইতে পারে, তাহারা জানেন না কী করিয়া নিজেদের রক্ষা করিতে হয় করোনা ভাইরাস হইতে। কিন্তু যেই কথিত এন-৯৫ মাস্ক পরিয়া চিকিত্সাকর্মীরা কোভিড রোগীদের সেবা করিতেছেন, সেই মাস্ক যদি নিম্নমানের হয়, তবে কতদিন আর তাহারা করোনা ভাইরাসকে ফাঁকি দিবেন? এই এন-৯৫ মাস্কের নামে তাহাদের অধিকাংশ সময় যাহা প্রদান করা হইয়াছে তাহাতে ধুলা কিছু আটকাইলেও কোনো ভাইরাস আটকায় না। কেবল মাস্ক নহে, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য দেওয়া ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই), ফেসশিল্প, হ্যান্ড গ্লাভস ও গগলসের মান খারাপ থাকিবার কারণেই তাহারা এত অধিক সংখ্যায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হইতেছেন। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস যেইখানে উন্নত দেশগুলির স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও নাকানিচুবানি খাওয়াইতেছে, সেইখানে আমাদের সম্মুখসারির যোদ্ধা তথা চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের কিনা লড়িতে হইতেছে মানসম্মত এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম লইয়া! ইহা অত্যন্ত লজ্জার! দুঃখের! বলিবার অপেক্ষা রাখে না, নিম্নমানের সুরক্ষা সরঞ্জামের কারণে চরম আতঙ্কে রহিয়াছেন চিকিত্সক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ করোনা চিকিত্সার সহিত সংশ্লিষ্টরা। দেশে আড়াই হাজারেরও অধিক চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত। এই সংখ্যাই বলিয়া দেয় পরিস্থিতি কতখানি ভীতিকর। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, দুর্নীতির মাধ্যমে নিম্নমানের জিনিসপত্র দেওয়া হইতেছে। ১৫ টাকার মাস্ক ১ হাজার টাকা দিয়াও ক্রয় করা হইতেছে! এই সকল বিষয়ে গোয়েন্দারা তদন্ত করিয়া একাধিক রিপোর্টও দিয়াছেন বলিয়া জানাইয়াছেন বিএমএ কর্তৃপক্ষ।

যেই অস্ত্র দিয়া করোনার বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষিত রাখিবেন, তাহাই যদি অরক্ষিত থাকে, তাহা হইলে চিকিত্সকরা হইয়া পড়েন ঢাল-তলোয়ার ছাড়া নিধিরাম সর্দার। দেশের এহেন স্বাস্থ্যব্যবস্থা লইয়া করোনার মতো অতি শক্তিশালী ও দুর্ধর্ষ ছোঁয়াচে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায় না। অথচ এই প্রতিকূল পরিবেশেই আমাদের চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি লইয়া কোভিডের চিকিত্সায় যুক্ত রহিয়াছেন! তাহাদের প্রতি নিঃসন্দেহে এই জাতি কৃতজ্ঞ থাকিবে। কেবল চিকিত্সাকর্মীদেরই নহে, জানা গিয়াছে, দেশের বাজারে পাওয়া যায় এমন অধিকাংশ সুরক্ষাসামগ্রীই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করিয়া তৈরি হয় নাই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারের ব্যাগ তৈরির কাপড় দিয়াই তৈরি করিয়াছে ভাইরাস হইতে রক্ষার অন্যতম সুরক্ষা উপকরণ পিপিই! করোনা ভাইরাসের এই সময়েও বিপুল মুনাফার আশায় নিম্নমানের এই সকল পিপিই তৈরি করিতেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। প্রকৃত অর্থে যেই সকল পিপিই পরিধান করিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে চিকিত্সা দিতে হইবে সেইগুলি অনেকগুলি ধাপ মান নিয়ন্ত্রণ করিয়া তৈরি করা হয়। সেইগুলির মূল্যও অধিক। অথচ এখন যে যেইভাবে পারিতেছে, নকল পিপিই নকল এন-৯৫ মাস্ক বানাইয়া বিক্রি করিতেছে। এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। সুরক্ষার সরঞ্জামে অরক্ষার বীজ বপন করিতে দেওয়া যায় না।