তালিকা প্রণয়নে জটিলতা!

আপডেট : ০৫ জুন ২০২০, ২১:৩৩

চিররঞ্জন সরকার

তালিকা বানানো সহজ কাজ নয়। সামান্য বাজারখরচের তালিকার কথাই ধরা যাক। আমরা অনেক ভেবেচিন্তে প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা বানাই। তালিকা অনুযায়ী বাজার থেকে ঐ সব জিনিস কিনে আনার পর দেখা যায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দুই-তিনটি জিনিস বাদ পড়ে গেছে! তখন ঐ জিনিসগুলো কেনার জন্য আবার ছুটতে হয় বাজারে। এই যে সংসারের বাজারখরচের তালিকা থেকে দুই-চারটি প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ পড়ে যাওয়া, এটা কিন্তু ভুল নয়। ঐ তালিকা তৈরির সময় সেগুলোর কথা মনে না পড়ার কারণে সেগুলো বাদ পড়ে যায়।

তালিকা প্রণয়নে ভুল হতেই পারে, কিন্তু দেখতে হবে সেই ভুলটা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত। মানুষ মাত্রই ভুল করে। অনিচ্ছাকৃত ভুলকে তাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু কোনো ভুল যদি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বা অবহেলা-উদাসীনতার কারণে হয়, তাহলেই দেখা দেয় বিপত্তি। এজন্য চড়া মাশুলও গুনতে হয় সংশ্লিষ্টদের। যেমন আপনি যদি চোখের কর্নিয়া অপারেশন করতে গিয়ে কারো নাকের অপারেশন করে ‘ছেদা’ বড়ো করে দেন, তাহলে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটতে পারে।

যা হোক, বাজারখরচের তালিকা প্রণয়ন করাটা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ কাজ। কিন্তু কোনো এলাকার মোট মানুষ, মোট গবাদিপশু ইত্যাদির তালিকা প্রণয়ন করা মোটেও সহজ কাজ নয়। হাজার হাজার মানুষের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে সব সময় জটিলতা দেখা দেয়। এ ধরনের তালিকা করতে গেলে আমরা কেমন জানি লেজেগোবরে করে ফেলি। ভোটার তালিকা নিয়ে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নকালে আমরা দেখেছি, সেখানে রাজাকারের নাম ঢুকে গেছে। আবার রাজাকারের তালিকায় স্থান পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধার নাম।

করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সদাশয় সরকার গরিব-দুঃখী মানুষকে ত্রাণ ও নগদ সহায়তা প্রদানের জন্য একটি তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। যথারীতি এই তালিকা নিয়েও শুরু হয়েছে লন্ডভন্ড অবস্থা। করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবার মাধ্যমে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে এককালীন আড়াই হাজার করে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা নগদ সহায়তা বিকাশ, রকেট, নগদ ও শিওর ক্যাশের মতো মোবাইল সেবার মাধ্যমে এ টাকা বিতরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রতি পরিবারে ধরা হয়েছে চার জন সদস্য, সে হিসাবে এই নগদ সহায়তায় উপকারভোগী হবে ২ কোটি মানুষ। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, শিক্ষক, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির এই সহায়তাপ্রাপ্তদের তালিকা প্রণয়ন করার কথা। এই ভাতা পাওয়ার তালিকায় আছেন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোলট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকের পরিবহন শ্রমিক, হকারসহ নিম্ন আয়ের নানা পেশার মানুষ। কিন্তু এ তালিকা তৈরিতে বড়ো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন জেলায় গরিব মানুষের খসড়া তালিকায় সচ্ছলরা স্থান পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত খবরে দেখা যাচ্ছে, প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতি ঠেকাতে সরকার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহায়তার অর্থ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জালিয়াতির কৌশল নিয়েছেন। তারা বিভিন্ন গরিব মানুষের নামের পাশে ব্যবহার করেছেন একটি মাত্র মোবাইল ফোন নম্বর। তালিকায় আছে মৃত ব্যক্তির নামও। তালিকা করা নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সদস্যদের চরম দ্বন্দ্বও সৃষ্টি হয়েছে।

অনেক জায়গায় নগদ টাকা দেওয়া হবে, তার জন্য কোনো তালিকা তৈরির নির্দেশনাই দেওয়া হয়নি। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কাছে ওএমএসের চাল দেওয়া হবে এমন ব্যক্তিদের নামের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই তালিকাকে নগদ টাকার তালিকা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক এলাকায় তালিকায় চেয়ারম্যান-মেম্বাররা তাদের ভাই, ভাতিজা-ভাতিজি ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে তালিকায় ঢুকিয়েছেন।

এর আগে কর্মহীন নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র ৩ কোটি ৮৫ হাজার মানুষকে বিশেষ ত্রাণসহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল সরকার। এ জন্য জেলা প্রশাসকদের তালিকা তৈরি করতেও বলা হয়। কিন্তু সেই তালিকা নাকি এখনো সম্পন্ন হয়নি। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় এমপি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের দ্বন্দ্বের কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

ত্রাণ ও সহায়তা প্রদানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত গরিব মানুষের তালিকা প্রণয়নের এই জটিলতা দেখে সাবেক সচিব ও লেখক ড. আকবর আলী খানের লেখা ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ গ্রন্থের ‘বিকেন্দ্রীকরণ ক্ষমতার দ্বৈত হস্তান্তর’ নামে একটি প্রবন্ধের কথা মনে পড়ছে।

আকবর আলী খান লিখেছেন, গত শতকের ষাটের দশকের প্রথম দিকে গল্পটি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজম খানের নামে প্রচলিত ছিল। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। চট্টগ্রামে ঘূর্ণিঝড়ের পর তিনি উপদ্রুত অঞ্চল সফরে যান। সেখানে তাকে খবর দেওয়া হয় যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকা সাত দিনের মধ্যে প্রণয়ন না করলে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে না।

এই বার্তা পেয়ে আজম খান সঙ্গে সঙ্গে চিফ সেক্রেটারিকে ফোন করেন এবং বলেন, ‘মি. চিফ সেক্রেটারি, আই ওয়ান্ট দ্য ডিসট্রেস্ড পারসনস লিস্ট ইন সিক্স ডেইস টাইম (তিনি হাতে এক দিন সময় রাখেন) অ্যান্ড ইফ ইউ ক্যান নট ডেলিভার অন টাইম, আই উইল গিভ ইউ এ কিক ইন দ্য ব্যাক।

সামরিক কর্মকর্তার গালি খেয়ে চিফ সেক্রেটারি কমিশনারকে ফোন করলেন এবং বললেন, ‘মি. চিফ সেক্রেটারি, আই ওয়ান্ট দ্য ডিসট্রেস্ড পারসনস লিস্ট ইন ফাইভ ডেইস টাইম অ্যান্ড ইফ ইউ ক্যান নট ডেলিভার অন টাইম, আই উইল গিভ ইউ এ কিক ইন দ্য ব্যাক।

কমিশনার এই ফোন পেয়ে ডেপুটি কমিশনারকে ফোন করলেন এবং বললেন, চার দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য তাকে দিতে হবে, অন্যথায় ডেপুটি কশিনারের পাছায় তিনি তিনটি লাথি মারবেন। ডেপুটি কমিশনার সঙ্গে সঙ্গে মহকুমা প্রশাসককে ফোন করলেন এবং বললেন যে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, তা তিন দিনের মধ্যে দিতে হবে আর না দিতে পারলে তার পাছায় চারটি লাথি দেওয়া হবে।

মহকুমা প্রশাসক সার্কেল অফিসারদের ফোন করলেন এবং বললেন, দুই দিনের মধ্যে সব তথ্য তার কাছে পৌঁছাতে হবে আর যদি সার্কেল অফিসার এ কাজ যথাসময়ে করতে না পারেন, তবে তার পাছায় পাঁচটি লাথি দেওয়া হবে। সার্কেল অফিসার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে জানালেন, দুই দিনের মধ্যে তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে, অন্যথায় তার পাছায় পড়বে ছয়টি লাথি।

লাথির হুমকিতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান চৌকিদারকে ডেকে তার পাছায় একটি লাথি মারেন এবং বলেন, এক দিনের মধ্যে সব তথ্য সংগ্রহ করে তাকে দিতে হবে, অন্যথায় তার কপালে আরো লাথি জুটবে। মনের দুঃখে চৌকিদার অফিস থেকে বের হয়ে সামনে যে ব্যক্তিকে পেলেন, তাকে প্রথমে চড় মারলেন, তারপর তার নাম জিগ্যেস করলেন।

নামটি সঙ্গে সঙ্গে কাগজে টুকে নিলেন। তারপর ভাবলেন যে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নাম চেয়েছে। শ দুয়েক নাম হলেই তার কাজ হয়ে যাবে। তিনি লোকটিকে বললেন যে তাকে আরো ১৯৯টি নাম বলতে হবে, অন্যথায় তাকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। ইতিমধ্যে চৌকিদারের কাণ্ড দেখে রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে গেছে।

সবার সহযোগিতায় এক ঘণ্টার মধ্যে ২০০ নামের তালিকা তৈরি হয়ে গেল। চৌকিদার সঙ্গে সঙ্গে তা চেয়ারম্যানের কাছে দাখিল করলেন। চেয়ারম্যান সঙ্গে সঙ্গে তা ওপরের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। এমনি করে সারা বিভাগের তথ্য যথাসময়ে সংকলিত হয়ে গভর্নরের কাছে যথাসময়ে পৌঁছায়। গভর্নর মহাখুশি যে বেঁধে দেওয়া সময়ের অনেক আগেই তার প্রশাসন কাজটি সম্পন্ন করেছে।

প্রশাসন সাফল্য দাবি করলেও আসলে কাজটি ব্যর্থ হয়। যে তালিকা প্রণয়ন করা হয়, সে তালিকা ভুয়া এবং যখন রিলিফ আসে, তখন ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও চৌকিদার ভুয়া লোকদের জন্য পাঠানো ত্রাণ অতি সহজে আত্মসাত্ করেন।

ওপরের দিকে কর্তারা এই ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন যে তাদের প্রশাসনব্যবস্থা কার্যকর এবং ঠিক সময়ে কাজটি করেছে। কিন্তু আসলে দেখা গেল যে ওপরের কর্মকর্তারা যতই হম্বিতম্বি করুন না কেন, লাথি খেয়েছেন চৌকিদার আর চড় খেয়েছেন সাধারণ মানুষ। দুর্গত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করা যায়নি আর ভুয়া তালিকায় রিলিফের মাল হয়ে গেছে চুরি।

আকবর আলী খানের উল্লিখিত গল্পটি এখনো প্রাসঙ্গিক এবং তাত্পর্যপূর্ণ!

n লেখক :রম্যরচয়িতা