রাকিবুল হাসান রাসেল
লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনার মূল হোতাকে গ্রেফতার করেছে র্যাব, এখানেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে সাঁড়াশি অভিযান চালানো প্রয়োজন; বিগত তিনবছরে কোন এজেন্সি কোথায় কত লোক পাঠিয়েছে, তাদের বর্তমান অবস্থা কী, কত করে টাকা নিয়েছে তাদের কাছ থেকে—এসব বিষয়ে জোরালো তদন্ত জরুরি। প্রয়োজনে আগামী একবছর বিদেশে লোক পাঠানো বন্ধ থাকবে! ক্যাসিনো ব্যবসায়ের চেয়েও ব্যাপক ইনকাম মানব পাচারকারীদের—এই পুঁজিবিহীন কাঁচা টাকার খেলার বলি দেশান্তরি মানুষগুলো।
প্রবাসী বাংলাদশি শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়োগ ব্যয় কমানোর জন্য মালয়েশিয়া কয়েকবার শ্রমিক নেওয়া স্থগিত করেছে, লোক নেওয়া বন্ধ আছে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও, কিন্তু আমার দেশ শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে স্বাধীনতার এত বছর পরেও ভাবার সুযোগ পাচ্ছে না! ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এমনকি প্রতিবেশী নেপালও বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে বার্গেনিং করে বেতনাদি ঠিক করে দিচ্ছে, ভারতের কথা না-ই বললাম। আর আমরা কী করছি? সতীনের পোলার মতো জাস্ট ঘর থেকে বের করে দিতে পারলেই বাঁচি! আর কোনো দায়িত্ব নেই!!
প্রবাসী বাংলাদেশিরা কিভাবে নিজের জমিজমা ও শেষ সম্বল বিক্রি করে নিজ নিজ প্রিয়মানুষগুলোকে ছেড়ে ভাগ্যবদলের আশায় বিদেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়—এটা একটা ওপেন সিক্রেট। টাকা ওঠাতে না পেরে মানসিক চাপ আর হতাশায় বাড়ছে আত্মহত্যা, অকাল মৃত্যু যা বিগত বছরগুলোতে দেশে আসা লাশের হিসেব দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি অজানা থাকার কথা নয়।
এদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে কামিয়ে নিচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। রাজধানীসহ দেশের আনাচে-কানাচে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিক্রুটিং এজেন্সি! এদের কার্যক্রমের নেই নিয়মিত সঠিক মনিটরিং কিংবা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা।
আদমশুমারির মতো যদি প্রবাসী শুমারির ব্যবস্থা করা যেত, যেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানা হবে প্রবাসী পরিবারের বাস্তব চালচিত্র, প্রবাসের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ খরচের বিপরীতে আয়-রোজগারের পরিমাণ ইত্যাদি—তাহলে বোঝা যেত প্রকৃত অবস্থাটি কী! দুঃখজনক বিষয় হলো—প্রবাসীদের নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনামা’ বিভিন্ন ক্যাটিগরিতে অনেকগুলো জাতীয় পুরস্কার জিতে নিলেও এর মোরাল অব দ্যা স্টোরি আমাদের কর্তৃপক্ষের নজর কাড়তে পারেনি!
এগারো লাখের বেশি ভিনদেশি রোহিঙ্গা আমাদের দেশে খেয়েপরে বাঁচে আর আমার দেশের নাগরিক না খেয়ে মরে প্রবাসে, নির্যাতিত হয় আরব-শেখদের বিছানায়, ডুবে মরে প্রশান্ত মহাসাগরের লোনা জলে, গুলি খেয়ে মরে লিবিয়ায় কিংবা থাইল্যান্ডের গহীন জঙ্গলে—যে কান্না আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি পর্যন্ত পৌঁছায় না! এ এক চরম হতাশা ও লজ্জার বিষয়!
ঢাকা
