নূরজাহান শিল্পী
ব্রিটেনের আকাশপানে তাকিয়ে ডুবে যাই গাঢ় নীলে। এই দুঃসময়েও স্বচ্ছ নীলাকাশ। ক’দিন ধরে আকাশ নির্মেঘ। প্রকৃতি যেন সজীবতা ফিরে পাচ্ছে। পাখিদের কিচিরমিচির সেই শৈশব ফিরিয়ে এনেছে। আরো সবুজে যেন রং-রূপ ধারণ করছে ঘাস। আপেল, আঙ্গুর গাছে ফুল এসেছে। প্লাম আরো বর্ণে ডুবে আছে। বনে প্রাণিদের উত্ফুল্ল বিচরণ। করোনা মড়কের আগ্রাসনে আবহাওয়া বদলে গেছে। কমে গেছে কার্বন নিঃসরণ। শব্দদূষণ নেই। অসহ্য হর্ন বাজে না এখন। ধরিত্রী আমাদের জীবনের খোরাক জোগায়। আমরা নির্বিচারে উজাড় করছি বন। নারী ভেবে নিয়ে ধরণীকে উপেক্ষা করে গেছি, ভেবেছি সর্বংসহা। অত্যাচার নির্যাতন কিছু বাকি রাখিনি। তাই তো প্রতিশোধের মড়ক করোনা নামে ফিরে এসেছে। মহাকালের আবর্তে মানুষ হত্যার নারকীয় উল্লাস যখন, পারমাণবিক বোমার আঘাতে মানুষ মারার কূট কৌশলে লিপ্ত অমানুষগুলো ঠিক তখনি অসহিংস পৃথিবীর অমোঘ আবর্তে ছড়িয়েছে বোমার অভিশপ্ত জীবাণু করোনা ।
বহুকাল পর সমুদ্রে নেচে উঠেছে ডলফিন। প্রথম প্রকৃতি থেকে বিবর্তিত হয়ে মানুষ তার বুদ্ধি বল অর্জন করে সমাজ গঠন করে। আধিপত্য বিস্তার করে। আজ এই আধিপত্য বিস্তারে প্রকৃতিকেই মানুষ কোণঠাসা করে চলেছে। ২১০০ সাল নাগাদ সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা ১.১ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনে পৃথিবীর ভবিষ্যত্ নিয়ে জাতিসংঘের রেড অ্যালার্ট। জাতিসংঘের একটি বিজ্ঞানী প্যানেল হুঁশিয়ার করেছে—মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন দ্রুত হারে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং বরফ গলছে। এসব বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোই মূলত দায়ী। দূষণের মাত্রা যে পর্যায়ে তাতে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, কৃষিক্ষেত্রে দূষণের প্রভাব, মাটিদূষণ, পানিদূষণ সবক্ষেত্রেই দূষণ ঘটছে। বাস-ট্রাক-ট্রেন-লঞ্চ-স্টিমারে হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ, বিমানের বিকট শব্দ, শিল্প-কারখানার শব্দ, মাইকের শব্দ, হাট-বাজার যানজট, জনসভা, মানুষের কোলাহল অস্বস্তিকর পরিবেশের জন্ম দিচ্ছে। আর হূদরোগ, মাথাব্যথা, অনিদ্রা, মানসিক বিপর্যয়, স্নায়ুবিক বৈকল্য মানবস্বাস্থ্যে এসব নানা উপসর্গ জন্ম দিচ্ছে দূষণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ইত্যাদিতে অবকাঠামোগুলো ধ্বংস হয়ে কৃষিজমির লবণাক্ততা বেড়ে মাটি দূষিত হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের নালা সাধারণত জলাশয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকায় শহর-হাটবাজার-বাসাবাড়ির আবর্জনা, বিভিন্ন প্রাণীর মলমূত্র নদীতে পড়ে দূষিত হচ্ছে পানি। জাহাজভাঙা শিল্পের বর্জ্য ও খনি থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ পানি দূষিত করছে। আইপিসিসির কো-চেয়ারম্যান ড. ক্রিস্টোফার ফিল্ড হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে পড়তে শুরু করেছে। এই সেদিনও প্রকৃতি তার ম্যাজিক দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—মানুষ যতই উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় তুচ্ছ করেছে প্রকৃতিকে; প্রকৃতি কিন্তু মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে অস্তিত্বের লড়াইয়ে।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ হলো আমাদের সুন্দরবন। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্পানের মধ্য দিয়ে তা আরেকবার প্রমাণ হলো। অতীতেও সিডর-আইলার সময় সুন্দরবন সুরক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবেশদূষণ প্রতিরোধে একক উদ্যোগ নয়, সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, সুরক্ষা এবং পরিচালনা প্রয়োজন। জলাশয় সাগর নদী দূষণমুক্ত রাখতে হবে। শব্দদূষণ রোধে বন্ধ রাখতে হবে যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন। অসুন্দর পৃথিবীকে সুন্দর করতেই মানুষের জন্ম। আসুন সবাই মিলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি। শালিকের ডানায় জন্ম নিক নতুন প্রভাত। বিশ্বের দেশে দেশে এই একটি লকডাউনই দৈবশক্তিতে প্রকৃতির স্বস্তি আমাদের জানান দিয়েছে। নয়তো পৃথিবীব্যাপী বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে উত্তপ্ত প্রকৃতিতে করোনার মতো অসংখ্য মানবঘাতী সংক্রামক বিস্তার লাভ করবে।
লন্ডন
