রিফাত মুনীর ইতি
কোভিড-১৯ নিয়ে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে বিশ্ব। ক্ষুদ্র এ অণুজীবটির বারংবার রূপ পরিবর্তন ব্যাহত করছে তার প্রতিষেধক আবিস্কার, যদিও বিজ্ঞানীদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়ম মেনে এটিকে আপাত দমনের চেষ্টা করা যেতে পারে। যেহেতু এটি প্রতিষেধক বিহীন, সেহেতু প্রতিরোধই উত্তম পন্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকেই।
এবার আসি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উত্কর্ষের এই যুগে আমাদের কোভিড সংস্কার ও আক্রান্ত মানুষের প্রতি চরম অবহেলার বিষয়টি নিয়ে। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত আমরা চারপাশের কোভিড আক্রান্তদের একরকম পাপী হিসেবে চিহ্নিত করে চরম দুর্ব্যবহার ও অবহেলার নজির রাখছি নিয়তই। আমাদের অন্ধ কুসংস্কারচ্ছন্ন মনোভাব এবং আধুনিক এই বিশ্বেও চরম একগুঁয়ে আচরণ অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে কোভিড পজিটিভ রোগীদের। অথচ সন্দেহাতীতভাবে ৯৫ শতাংশ রোগীর প্রয়োজন প্রিয়জনদের সহমর্মিতা, তাদের মানসিক সমর্থন ও জোরালো ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে সাহায্য করা। কারণ মানসিকভাবে দুর্বল একজন মানুষ সাধারণ সর্দিতেও মৃত্যুবরণ করতে পারে।
সম্ভবত, বাংলাদেশের জন্য এটিই সেই দীর্ঘ ক্রান্তিকাল ও চরম ক্রাইসিসের মুহূর্ত, যখন আমরা দেখছি কোভিড পজিটিভ শোনামাত্র, একটা নিবিড় আন্তরিক পরিচিত পরিমণ্ডলের চেহারার রাতারাতি পরিবর্তন। বৃদ্ধ মা-বাবাকে ঘর থেকে বাইরে ফেলে আসা, অসুস্থ স্বামীকে ঢুকতে না দেওয়া, ভাড়াটিয়ার প্রতি নির্মম আচরণ, ঘরের মধ্যে আটকে রাখা কোভিড রোগীর মৃত্যু এমন নানান ঘটনার সাক্ষী হচ্ছে বাংলাদেশ । এখন এই পরিস্থিতিতে আমাদের করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মানা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাসহ নানান দিক নির্দেশনার পাশাপাশি আক্রান্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের তাগিদ তৈরি করতে হবে। এটি খুব সহজ নয় সত্যি, কিন্তু অসম্ভব নয়। টেলি ও প্রেস মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌক্তিক বয়ানে, ডাক্তারদের কাউন্সিলিংয়ে, বেতার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইনে নাটক বা বিজ্ঞাপন তৈরি করে এই আন্দোলন সচল ও কার্যকর করা সম্ভব।
কোভিডযুদ্ধের সম্মুখ সারির যোদ্ধারা, যারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রতিও যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করা, অন্যক্ষেত্রে বিরূপ মনোভাব পিছিয়ে দিচ্ছে সামগ্রিক করোনাযুদ্ধকে। মূলত আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার সবার আগে, আর তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। অন্যথায় ক্রমশ অগ্রগামী বিশ্বে পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবে পরিগণিত হবো আমরা। আমরা ব্যর্থ হব কোভিডের মৃত্যুহার কমাতে, তারচেয়েও বেশি আশঙ্কাজনক হচ্ছে করোনা আমাদের ভ্রান্ত কুসংস্কারে প্রভাব ফেলে করে তুলবে চরম অমানবিক—যেটি শুধু জাতি হিসেবে বাঙালির পরাজয় হবে না, বরং আমাদের এই মানবিক পৃথিবীতে হবে বিশ্ব মানবতার পরাজয়। কাজেই করোনাকে দূরে রাখতে এবং একইসঙ্গে প্রিয়জনদের বাঁচাতে আমাদের দরকার মানবিকতার পরিচর্যা। দূরত্ব মেনে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আমাদের আরো সহনশীল, আরো মানবিক, আরো দয়াবান হতে হবে। শুধু তাহলেই কোভিডমুক্ত বাংলাদেশ প্রত্যাশা করতে পারি আমরা।
ঢাকা
