সচেতনতার ভাষা

আপডেট : ০৫ জুন ২০২০, ২১:৩৬

শ্যামল কান্তি দত্ত

 

মানুষকে সচেতন করতে হলে তাকে কিছু বিষয় জানাতে হয়। আর মানুষকে কিছু জানানোর মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। সে ভাষা হতে হয় যাদের জানানো হবে তাদের উপযোগী বা তাদের বোধগম্য। অবশ্য ভাষার সংজ্ঞাও সে কথাই বলে—বক্তার উচ্চারিত ধ্বনি সমষ্টি যদি শ্রোতার বোধগম্য হয় তবেই তা ভাষা। আমরা করোনা রোগী শনাক্ত হবার সংবাদ জানতে গিয়ে প্রতিদিন অনলাইন সংবাদ সম্মেলন থেকে জানছি—করোনা পজেটিভ রোগীর সংখ্যা, কোয়ারেন্টাইনে লোকসংখ্যা, আইসোলেশনে লোকসংখ্যা এবং কত জন মৃত্যুবরণ করলেন ইত্যাদি। সেদিন এক ইংরেজির অধ্যাপক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন—এ শব্দদুটোর পার্থক্য কী। তিনি বললেন, ‘শব্দদুটো সমার্থক’। বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধানে দেখলাম—কোয়ারেন্টাইন মানে রোগসংক্রমণ প্রতিরোধকল্পে মানুষ ও প্রাণীকে আলাদা বা আটক রাখার ব্যবস্থা। আর আইসোলেশন মানে বিচ্ছিন্নকরণ, পৃথককরণ, অন্তরণ। তবু ব্যবধান স্পষ্ট করে বোঝাবার মতো বোঝা গেল না। এমন আরো অনেক নতুন শব্দ আমাদের শুনতে হচ্ছে করোনা প্রসঙ্গে। যেমন—লকডাউন, সোশাল ডিসট্যান্স বা সামাজিক দূরত্ব, হ্যান্ড স্যনিটাইজার, মাস্ক ইত্যাদি।

শব্দগুলো কেবল নতুন আর বিদেশি-ই নয়, এগুলো মূলত চিকিত্সাশাস্ত্রের পারিভাষিক শব্দ। ভাষাশাস্ত্র পাঠে আমরা জানি যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় একগুচ্ছ চাবিশব্দ ব্যবহূত হয়ে থাকে, যেগুলোর তাত্পর্য সুনির্দিষ্ট ও অদ্ব্যর্থ। ঐ শব্দগুচ্ছই পারিভাষিক শব্দ। অভিধানে ‘পরিভাষা’র অর্থ সংক্ষেপার্থ শব্দ। অর্থাত্ যে শব্দ দ্বারা সংক্ষেপে কোনো বিষয় ব্যক্ত করা যায় তাকে বলে পরিভাষা; ইংরেজিতে বলে টারমিনোলিজি বা টেকনিক্যাল টার্ম। পারিভাষিক শব্দগুলো পৃথিবীর উন্নত ভাষাগুলোতে সাধারণত ভাবানুবাদ করে ব্যবহার করা হয়। যেমনটা আমরা ‘রেডিও পাকিস্তান’ পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ বেতার’ করেছি। এখানে ‘রেডিও’-র পারিভাষিক শব্দ ‘বেতার’। এ কারণে অনেকে বিদেশি শব্দের ভাবানুবাদমূলক প্রতিশব্দকে বলেন পারিভাষিক শব্দ।

গত ৭ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ছড়ায় তপন বাগচী কোয়ারেন্টিনের পরিভাষা করেছেন ‘ঘরেঠাঁই’। হায়াত্ মামুদ তাঁর ‘ভাষা-শিক্ষা’ (২০০১) বইয়ে লিখেছেন ‘সঙ্গরোধ’। আর মাহবুবুল হক রচিত ‘বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ (২০০১) বইয়ে পরিভাষা করেছেন ‘সঙ্গনিরোধ’। উন্নত বিশ্বে পরিভাষা বললে ‘এমন শব্দ বা শব্দাবলি বোঝায় যার অর্থ পণ্ডিতগণের সম্মতিতে স্থিরীকৃত হয়েছে এবং যা দর্শন বিজ্ঞানাদির আলোচনায় প্রয়োগ করলে অর্থবোধে সংশয় ঘটে না।’ অথচ আমরা একেক জন একেক পরিভাষা সৃষ্টি করে ভাষাকে আরো দুর্বোধ্য করছি নাকি?

মাস্ক, হ্যন্ড স্যানিটাইজার ইত্যাদি শব্দ অবশ্য ছবি দেখেই চেনা যাচ্ছে; কিন্তু কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন শব্দদুটোর সহজ পরিভাষা স্থির করে এর সংজ্ঞা দিয়ে সংজ্ঞার্থ সাধারণের কাছে তুলে ধরতে হবে। লকডাউন শব্দটি অপরিচিত বলেই এটি কার্যকরে আমাদের ব্যর্থতা। এর পরিবর্তে ‘হরতাল’, ‘জরুরি অবস্থা’ বা ‘১৪৪ ধারা’ প্রচার করলে হয়তো জনগণকে বোঝানো যেত। কিংবা লকডাউন শব্দের নতুন পরিভাষা তৈরি করা যেত। অবশ্য আমাদের দেশে পোশাকশ্রমিক, আনসার, পুলিশ, ছাত্র যাঁরা গণরুমে গাদাগাদি করে একসঙ্গে অনেকে থাকেন তাঁদের লকডাউন কার্যকর করা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। তবে হ্যন্ড স্যনিটাইজারের পরিবর্তে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলা হলেও ছাই দিয়েও যে হাত ধোয়া যায় সে বিষয়টি সহজ ভাষায় আরো আকর্ষণীয় করে প্রচার করা প্রয়োজন। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে যেমন বাংলাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে পণ্য-সেবা সাধারণের কাছে পরিচিত করা হচ্ছে তেমনি করোনা বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারণাও বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় প্রণয়ন করে প্রচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। 

চট্টগ্রাম