সরকারের সঙ্গে সমঝোতার কারণে গত প্রায় এক মাসের বেশি সময় গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া বন্ধ থাকার বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই ইস্যু। বিভিন্ন কারখানার মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে গার্মেন্টসে ছাঁটাই শুরু হয়ে গেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক মাসে গার্মেন্টসের প্রায় ২৫ শতাংশ শ্রমিক ছাঁটাই হবে বলে জানিয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। বর্তমানে গার্মেন্টস খাতে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। সেই হিসাবে আগামী কয়েক মাসে ছাঁটাইয়ের কবলে পড়তে পারেন ৮ থেকে ১০ লাখ শ্রমিক। তিনি বলেন, ছাঁটাই হবে এটাই সত্য।
করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর গার্মেন্টস কারখানায় লে-অফ (সাময়িক বন্ধ ঘোষণা) ও শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। এ নিয়ে শ্রম অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় মে পর্যন্ত শ্রমিক ছাঁটাই ও লে-অফ না করার অঙ্গীকার করেছিল মালিকপক্ষ। শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার খবর তাদের কাছে রয়েছে। আগামী কয়েক মাস যাবত্ এটি চলবে। তবে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার ইত্তেফাককে বলেন, তাদের হিসাবে ইতিমধ্যে অন্তত ৭০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। হিসাবের বাইরেও অনেক শ্রমিক রয়ে গেছেন।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গত বুধবার তানাজ ফ্যাশন নামে ২ হাজার ৮০০ শ্রমিকের একটি কারখানা ১ হাজার ১৩৯ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। অন্যদিকে সেবলি নামে ৬০০ শ্রমিকের একটি কারখানা গত ২ জুন বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পাঞ্চল পুলিশের হিসাবে, গত কয়েক দিনে প্রায় ৯ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছে। জানা গেছে, ইতিমধ্যে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন রাজধানীর মালিবাগের ড্রাগন সোয়েটার ঈদের পরে বন্ধ হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের বিসিক শিল্প এলাকায় ৮৫০ জন শ্রমিকের একটি কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। তার নিজের কারখানায় এমবি নিট ফ্যাশনে ইতিমধ্যে ১০ শতাংশ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আরো ৩০ শতাংশ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া আরো একাধিক পোশাকশিল্পের মালিকের সঙ্গে আলাপ করে শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, গার্মেন্টসের ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় ক্ষুব্ধ শ্রমিক সংগঠনগুলো। বিজিএমইএর সভাপতির ঘোষণার পর এর প্রতিবাদ জানিয়েছে কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন। এছাড়া গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একাধিক শ্রমিক সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। আজ শনিবারও কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন এই প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া গত কয়েক দিনে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে ডিআইএফইতে চিঠি পাঠিয়েছে কয়েকটি সংগঠন। শ্রমিকনেত্রী জলি তালুকদার বলেন, আগামী রবিবার তাদের সংগঠনও চিঠি পাঠাবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিক ছাঁটাই নিয়ে মালিকপক্ষের অবস্থান অনাকাঙ্ক্ষিত। গার্মেন্টস খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার শুরুতেই সহযোগিতা করেছে। ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে তাদের জন্য। সবকিছুই শ্রমিকের কথা বিবেচনা করে মালিকের নগদ অর্থের প্রবাহে যাতে চাপ না পড়ে। তিনি বলেন, কারখানাগুলো ৭০ শতংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে। কোনো কোনো কারখানায় অর্ডার বাড়ছে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় ছাঁটাই করার ঘোষণা দেওয়ার সময় এখনো আসেনি।
