চট্টগ্রাম করোনা ভাইরাসের হট স্পটে পরিণত হয়েছে। এই পর্যন্ত ৮৯ জন করোনায় মারা গেছেন। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিত্সা সুবিধা না থাকায় আক্রান্ত রোগী চিকিত্সা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করেও প্রয়োজনীয় চিকিত্সা পাচ্ছেন না। সরকারিভাবে চিকিত্সা সেবা সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও তা ‘হবে হচ্ছে’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে অনেক রোগী মারা গেছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সুবিধা থাকলেও তারা করোনা রোগীদের চিকিত্সা দিচ্ছে না। ফলে চট্টগ্রামে করোনা রোগীরা চিকিত্সার জন্য ছুটছেন ঢাকায়।
চট্টগ্রাম মহানগরীর ১২টি এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় ১০০ জনের বেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্ত রোগী ৪ হাজারের কাছাকাছি। সরকারিভাবে যেসব হাসপাতালে চিকিত্সা চলছে তাতে জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। রোগীরা বেসরকারি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে ভর্তি হতে পারছেন না। অপ্রতুল চিকিত্সা সুবিধার কারণে চট্টগ্রামে অধিকাংশ করোনা রোগী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন। বিত্তবানরা ঢাকায় গেলেও আর্থিক অস্বচ্ছল রোগীরা যেতে পারছেন না।
চিকিত্সা নিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে করোনা রোগীদের। করোনা রোগের প্রাদুর্ভাব শুরুর ৩ মাস অতিবাহিত হলেও চট্টগ্রামে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত চিকিত্সা সুবিধা বাড়েনি। সব কিছু পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। অনেকে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন। করোনা রোগীদের এক পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু শুরুতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে যে ১০টি আইসিইউ বেড হয়েছে তা আর বাড়েনি। অথচ চট্টগ্রামে প্রতিদিন ২০০ এর ওপরে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
চট্টগ্রামে করোনা রোগীর চিকিত্সা সেবা নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মোহাম্মদ আমিনুল হাসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে চিঠি দিয়ে করোনা রোগীর চিকিত্সা না করলে লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারি দিয়েছি। চট্টগ্রামের বিষয়টি আমরা মনিটরিং করছি। আইসিইউ বাড়ানোর কাজ চলছে।’
দেশের এই সংকটাপন্ন মুহূর্তে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর অমানবিক আচরণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা কোনো করোনা রোগীর চিকিত্সা দিচ্ছে না। সরকারিভাবে নানা হুঁশিয়ারি ও লাইসেন্স বাতিলের কথা বলা হলেও এখনো পর্যন্ত প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে সাড়া দেয়নি। তারা নানা টালবাহানা করে এড়িয়ে চলেছে। চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিটি ১২টি প্রাইভেট ক্লিনিককে করোনা রোগীর চিকিত্সা করার জন্য চিঠি দিয়েও সাড়া পায়নি।
চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিত্সা সেবা কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য সরকারিভাবে আরেকটি সার্ভেইল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের প্রধান করা হয়েছে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মো. মিজানুর রহমানকে। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা ২০টি প্রাইভেট ক্লিনিকের তালিকা করেছি। এসব হাসপাতালে ১২১টি আইসিইউ বেড রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সার্কুলারের কপি তাদের দিয়েছি। দৈনিক কতজন করোনা ও নন করোনা রোগী চিকিত্সা দিচ্ছেন ও কয়টি বেড রয়েছে তার বিস্তারিত তথ্য প্রতিদিন সকাল ১০টায় কমিটির কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিট খালি পড়ে রয়েছে। এটা অমানবিক কাজ। তাদের তথ্য পাওয়ার পর গঠিত টিম ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন।’
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ করে স্বাচিপের পক্ষে করোনা চিকিত্সা সংক্রান্ত কমিটির সমন্বয়ক ডা. আ ন ম মিনহাজ উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে সরকারি সুবিধা বাড়ানো নিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ব্যর্থ হয়েছেন। চমেক হাসপাতালের পরিচালক নিজে উদ্যোগী হয়ে ৫টি ডায়ালাইসিস মেশিনের ব্যবস্থা করতে পারলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা একটি আইসিইউ বেড সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে রোগীদের চিকিত্সা নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
প্রাইভেট হাসপাতালগুলো তাদের আইসিইউ চালানোর জন্য দক্ষ চিকিত্সকের সংকট তুলে ধরছে। আইসিইউ বেডে রোগীদের সাধারণত অ্যানেন্থেসিওলজিস্টরা চিকিত্সা দিয়ে থাকেন। অথচ চট্টগ্রামে প্রায় ২০০ জন অ্যানেন্থেসিওলজিস্ট রয়েছেন। তারাই চট্টগ্রামে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিত্সা সেবা দিচ্ছেন। এখন তারা নানা টালবাহানা শুরু করেছেন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি ইত্তেফাককে বলেন, যেসব প্রাইভেট হাসপাতালে ৫০ বেড আছে তাদের করোনা রোগীদের ভর্তির জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে। আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অক্সিজেনের সংকট রয়েছে। তারপরও আমরা চাহিদা অনুপাতে অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টা করছি। আগামী সোমবার থেকে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিত্সা শুরু হবে। ইম্পেরিয়ালে বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু চিকিত্সক না পাওয়ায় চালু করা যাচ্ছে না। তারা পত্রিকায় চিকিত্সক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাড়া পায়নি। হলি ক্রিসেন্ট ও রেলওয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি চলছে।
