‘সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি সংগীত পরিচালকদের দায়বদ্ধতা থাকা খুব জরুরি’

আপডেট : ০৬ জুন ২০২০, ১৯:২৯

তপন চৌধুরী। আশি-নব্বই দশকের সংগীত জগতে এক তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় তারকার নাম। এরপর সোলস ও নিজের সলো ক্যারিয়ারে অগণিত জনপ্রিয় গান কালোত্তীর্ণ হয়েছে। শ্রোতা-দর্শকদের ভালোবাসায় এখনও প্রতিনিয়ত সিক্ত হন দেশের বরেণ্য এই সংগীতশিল্পী। তার গান স্টেজে গেয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন এমন গায়ক-গায়িকাও এদেশে এখন অনেকে! গৃহসন্ধি আড্ডার দীর্ঘ আলাপে শিল্পী জানালেন নিজের দীর্ঘ সাফল্যের যাপিত জীবনের কিছু গল্প। তারই কিছু অংশ তুলে ধরা হলো ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন তানভীর তারেক 

দাদা কেমন আছেন ?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর দিয়ে কী হবে? তবু সবাইকেই বলি মোটামুটি ভালো আছি। সবসময়ই এমনটাই বলি সবাইকে। আজীবন এই মোটামুটি ভালোই থাকতে চেয়েছি, থেকেছি। জীবনে উচ্চাশা কখনও ছিল না, আজও নেই। তাই ভালো আছি। এর ভেতরে প্রিয় মানুষদের হারাচ্ছি দিনদিন। সেগুলো গভীর এক বেদনা তৈরি করছে। এসব হাহাকারের ভেতরে বসবাস করে চলছি। সর্বশেষ আজাদ রহমানও চলে গেলেন।

 

‘দূরের মানুষ’ শিরোনামে সুুবীর নন্দীর একটি আনরিলিজ ট্র্যাক মুক্তি পেল। দাদার সঙ্গে আপনার অগণিত স্মৃতি। দু-একটা যদি শেয়ার করতেন...

দাদার কথা কী আর বলবো। এ রকম নির্মোহ মানুষ আর আসবে না। একজন মহীরূহ মানুষ ছিলেন। যিনি পাঁচ পাঁচবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। সরকারিভাবে অনেককিছু পাওয়ার সুযোগ এসেছে তার। কিছুই নেননি। বলতেন, না থাক। আমার তো আছেই। যার নেই, সে পাক। সুবীর দার সুরে আমার কয়েকটি গান রেকর্ড করা আছে, যা এখনও রিলিজ হয়নি। কবির বকুলের লেখা ও তোমার সুরে এই গানটি নিয়ে দারুণ এক মুগ্ধতা ছড়ালো আমারও। কবির বকুল গানটি লিখেছেও একেবারে অফট্র্যাক ভাবনা থেকে। সুবীর দা সবসময় তার সুরকারকে প্রাধান্য দিতেন। তাই তোমার সুরে এটা আলাদা এক ভিন্নতা পেয়েছে। দাদা বলতেন আমি আমার মতো গাইলে তো আবারও একটা সুবীর নন্দীরই গান হবে। এই আধুনিক মনস্কতা কিন্তু সবার থাকে না। আমি আজ স্পষ্ট করে একটা কথা বলতে চাই, আমি অনেক তরুণ সুরকারকে বলেছি, সুবীর নন্দী, হাদী ভাই, রফিকুল আলম এরা কালজয়ী শিল্পী, তাদের গান করো তোমরা। বাপ্পা মজুমদারকেও বলেছিলাম একদিন। কিন্তু সামনা-সামনি হ্যাঁ বললেও গান আর হয়নি। এগুলো আমাকে খুব কষ্ট দেয়। মানুষ জীবিত থাকাকালীন কেউই তাকে আমরা ব্যবহার করতে পারি না। আমার প্রশ্ন এসব ফাইনেস্ট আর্টিস্টদের গান কেন বের হবে না? তাহলে এত এত সংগীত পরিচালকের কী কোনো দায়বদ্ধতা নেই? কারণ সবাই এখন নিজেই নিজের গান করা নিয়ে ব্যস্ত। সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি সংগীত পরিচালকদের দায়বদ্ধতা থাকা খুব জরুরি। অথচ আজ চাইলেও সুবীর নন্দীকে পাওয়া যাবে না।

 

ক্যারিয়ারের এই দীর্ঘ পথে আপনার অনুজপ্রতিম অনেকেই চলে গেছেন। আইয়ুব বাচ্চু যেমন। আপনার হাত ধরেই যার মেইনস্ট্রিম ব্যান্ড জগতে যাত্রা। এরপর আপনাদের যুগল সৃষ্টি পলাশ ফুটেছে থেকে শুরু করে অগণিত গান পেয়েছি আমরা। একটু স্মৃতি থেকে শুনতে চাই—

বাচ্চুর কথা কোত্থেকে বলবো, আর কোথায় শেষ করবো। ও আমার ভীষণ স্নেহের ছিল। বাচ্চু সোলসে জয়েন করার আগে একটা ব্যান্ড করতো, স্পাইডার। সেই সময়ে আমাদের কোনো শো হলে দেখা হতো। তখনকার শো হতো প্যান্ডেল টাঙিয়ে। অনেক রাতে শেষ হতো। শেষ করে দেখতাম বাচ্চু এগিয়ে আসছে। এসেই বললো, ‘বড়দা আপনাদের গান শুনতে এসেছি। আমি আপনাদের সঙ্গে বাজাতে চাই।’ আমি বললাম, কেন বাজাবে না। তুমি তো অনেক ভালো গিটারিস্ট। আর বাচ্চু তখন থেকেই ওর মিউজিক মুন্সিয়ানায় এলাকায় আমাদের চোখে দারুণ এক অবস্থান তৈরি করেছিল। সেভাবেই একবার একটা শোতে রনি নেই, ও বাজালো। এরপর অগণিত দিনরাতের যাপন আমাদের। সোলসে জয়েন করার পর তো একটা ইতিহাস। আর এ কথা বাচ্চু প্রায়ই বলতো যে ব্যান্ড আর্টিস্ট বা রক আর্টিস্ট হিসেবে একজন আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম কিন্তু আমার হাত ধরে। এখন তো মানুষেরা নানাভাবে নানা কথা বলে। শুধু চুপচাপ শুনি। কিন্তু বাচ্চু আসলে আমার এই মিউজিক পরিবারে এক আদুরে সন্তানের মতো।

 

এই কোভিড আক্রান্ত পৃথিবীতে তো সবাই যার যার অবস্থানে আটকে গেল। আপনি কানাডা ফিরে গেলেন। সহসা আবার দেশের ফেরার নিশ্চয়ই সম্ভাবনা কম। কীভাবে সময় কাটছে এখন আপনার?

গান গেয়ে, গান শুনে, মুভি দেখে, বই পড়ে। আর স্ত্রী সন্তানের সঙ্গে গল্প করে। এছাড়া তো আমি জীবনে কিছু করতে শিখিনি। দেশের বাইরে এসে একবার মনে মনে স্থির করেছিলাম যে, সবার মতো আমিও গানের পাশাপাশি ট্যাক্সি চালাবো। আমার ছেলে করতে দেয়নি। ওই এখন আমার সবটুকু পৃথিবী। আমার গানের সুরেই বলি, ‘আমি সবকিছু ছাড়তে পারি, ওকে ছাড়তে পারবো না।’ এর বাইরে কিছু অনলাইন লাইভ আড্ডায় অংশ নিচ্ছি, তবে খুবই বেছে বেছে। আর সবকিছু স্বাভাবিক না হলে আপাতত ঘর থেকে বের হতে চাই না।