অণুগল্প

করাতে কাঠ

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:০০

ব্যালকনি থেকে ফারহানা দেখল লোকটি এমনভাবে হেঁটে ফিরছে যেন পর্বতশৃঙ্গ থেকে সমতলভূমিতে নেমে আসছে। একটু পরই ডোরবেল বেজে উঠল। পাখির ডাক। ফারহানা খুলে দিতেই লোকটি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে মোটা কাগজে মোড়ানো প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘স্যার আজো আসবেন না। মনে হয় বৈকণ্ঠপুর গিয়েছেন। জানি না সঠিক। উনার অফিসের হেডক্লার্ক এটি আপনাকে দিতে বললেন।’

কালিঘাট চা বাগানে শেহজাদ ম্যানেজার পদে বদলি হয়ে আসার পরই ফারহানার কেন জানি এই বাংলোতে ওঠার পর মনে হয়েছিল কোনো অঘটন ঘটবে। শেহজাদের সঙ্গে শেয়ারও করেছিল। সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।

লোকটি চলে গেলে ফারহানা প্যাকেট খুলল। কয়েকটি মার্কার কলম, ছয়টি স্টেপলার ও দুটো ডায়েরি। সন্ধ্যা নেমেছে। চারপাশে চা-বাগানের ভেতর থেকে শেয়াল একনাগাড়ে ডাকা শুরু করেছে। সাতটা বাজার ঘণ্টা বাজে কারখানার ঘণ্টায়। ইলেকট্রিক কেতলির পানি ফুটেছে বলে লালবাতি নিভে গেল। ফারহানা কফি বানিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ডায়েরি দুটো নিয়ে বসেছে। শেহজাদের হাতের আলপনার মতো লেখ্যরূপ। একের পর এক চিঠি লিখেছে ডায়েরিতে। নিজেরই কাছে। এটি কোনো স্টাইল হতে পারে কি না ফারহানা জানে না। শেহজাদ নিজেকেই কিছু বলেছে কি না জানে না। একটা চিঠির নমুনা এমন, ‘প্রিয় শেহজাদ তুমি খুব কুিসত সেটি ফারহানা মনে করে, এ কথা তুমি ভালো করেই জানো। জানো, সে নিজেকে ভীষণ সুন্দরী ভাবে। একসময় মডেলিং করত। নাটক করত। এসব নিয়ে তার অহংকার আছে। বেশি অহংকার সে খুব সুন্দরী বলে। কিন্তু তুমি তো জানোই সৌন্দর্যের ধারণা নিরীহ ও নিরপেক্ষ নয়। সৌন্দর্যের ধারণাকে সামাজিকভাবে তৈরি করা হয় এবং বৈধতাও দেওয়া হয়।’ পরের পৃষ্ঠা উল্টাতেই সেলফোন বেজে উঠল, হেড ক্লার্ক বললেন, ‘মেমসাহেবা, স্যারের লাশ পাওয়া গেছে বৈকুণ্ঠপুরে। আপনি কী করতে বলেন? পুলিশে জানাব নাকি লাশ নিয়ে শ্রীমঙ্গল যাবেন?’

বৈকুণ্ঠপুর যাওয়া এবং সেখান থেকে শ্রীমঙ্গল থানায় ট্রাক্টরে করে শেহজাদের লাশ নিয়ে যাচ্ছিল ফারহানা। ফুলছড়া পেরিয়ে বিটিআরআইয়ের মোড়ের আগে একটা করাতকলের হ্যাজাক বাতির আলোয় দেখল শেহজাদ দাঁড়িয়ে একটা মেশিনে কাঠ কাটছে করাত দিয়ে। নিচে শান বাঁধানো বড় কুয়োর মতোন শবাধার।

এরপর থেকেই সারাটা জীবন ফারহানা কেবলই করাত দিয়ে কাঠ কাটার শব্দ শুনে আসছে। এর চেয়ে বেশি আর কোনো গল্প নেই ফারহানার জীবনে।