রাজশাহীতে করোনাজয়ী এক পরিবারের গল্প

আপডেট : ০৭ জুন ২০২০, ২০:২৫

রাজশাহী মহানগরীর একই পরিবারের তিনজন করোনা জয় করেছেন। তৃতীয়বার নমুনা পরীক্ষায় তাদের রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় পরিবারটির বাড়ি থেকে লকডাউন তুলে নিয়েছে পুলিশ। 

গত ১৫ মে মহানগরীর উপর ভদ্রা এলাকার ওই পরিবারে প্রথম এক নারীর করোনা শনাক্ত হয়। মহানগরীতে শনাক্ত হওয়া প্রথম করোনা রোগী তিনিই। উম্মে কুলসুমের (৫০) কয়েকদিন পর তার স্বামী খাদেমুল ইসলাম (৬১) ও মেয়ে রুকাইয়া ইসলামের (১৯) করোনা পজেটিভ রিপোর্ট আসে। খাদেমুল ইসলাম বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। রুকাইয়া ঢাকা সিটি কলেজের মার্কেটিং প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। উম্মে কুলসুম গৃহিনী। ছোট ছেলে কাওসার ইসলাম কমল নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজের এইচএসসির শিক্ষার্থী। 

জানা যায়, উম্মে কুলসুম ছেলে কাওসারের কাছে গিয়েছিলেন মাস দুয়েক আগে। ফিরে আসেন ১০ মে। সঙ্গে ছিলেন বড় ছেলে শিবলী ইসলাম কাননের স্ত্রী ফাহমিমা সাইফ রুমকি। ফেরার পথে লকডাউনে পথে পথে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। উম্মে কুলসুম কথা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাসায় ফিরে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। তিনি কথা রেখেছেন। বাসায় ঢুকেই তিনি নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় ফোন করেন। এরপর পুলিশ তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করে। এরপর ১৫ মে উম্মে কুলসুম, ছোট ছেলে ও পুত্রবধূর নমুনা উম্মে কুলসুমের পজেটিভ এবং অপর দুজনের নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। পরে তার স্বামী ও মেয়েরও পজিটিভ রিপোর্ট আসে। মেয়ে রুকাইয়া কয়েকদিন বেশ অসুস্থ থাকলেও তার বাবা-মায়ের তেমন সমস্যা হয়নি। দ্বিতীয় দফায় নমুনা পরীক্ষায় সবার নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। শনিবার তৃতীয় দফায় নমুনা পরীক্ষার পর রাতেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস উম্মে কুলসুমকে ফোন করে জানান, তাদের তিনজনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। তারা সকলেই করোনামুক্ত। 

নগরীর বোয়ালিয়া থানার ওসি নিবারণ চন্দ্র বর্মণ বলেন, পরিবারটি খুবই সচেতন। কীভাবে করোনা জয় করতে হয় তা তারা দেখিয়ে দিলেন। আমরা তাদের ফুলের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। এভাবে সব মানুষ যদি সচেতন থাকতেন তাহলে করোনা মোকাবিলা সহজ হয়ে যেত।

পরিবারের বড় ছেলে শিবলী ইসলাম বলেন, আম্মু শহরের প্রথম রোগী। তখন খুব খারাপ অনুভূতি ছিল যে, আমি প্রিয় শহরটাকে বিপদে ফেলে দিলাম! আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে আমাদের নিজেদের বেশি অপরাধী মনে হয়েছে। সেই টেনশন থেকেই আমরা সিরিয়াস হয়েছি। একজন থেকে বাড়িতে রোগী তিনজন হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে আলাদা ঘরে রেখে সবকিছু সামলেছে তার স্ত্রী। আমাদের পরিবার থেকে কোথাও করোনা ছড়ায়নি। তিনি বলেন, সবেমাত্র আমাদের পরিবারকে করোনামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখনই কেউ বাসার বাইরে যাবে না। আমিও চাকরির সুবাদে বাইরে থাকি। কিন্তু রাজশাহী শহরের কোনও করোনা আক্রান্ত পরিবারের কারও কোন সহযোগিতা লাগলে অবশ্যই আমরা এগিয়ে যাব। কারণ, আমরা ওই সময়টা পার করেছি। আমরা বুঝেছি, সময়টা কত কষ্ট করে পার করতে হয়। এই সময়টা মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। 

তিনি বলেন, আমরা সুস্থতা পেয়েছি। আল্লাহ আমাদের সুস্থ করেছেন। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। করোনা জয় করার পর প্লাজমা ডোনেট করা যায়। এখন ডাক্তার যদি আমাদের পরিবারকে প্লাজমা দেয়ার পরামর্শ দেন, তাহলে আমরা অবশ্যই দেব। কারণ, আমাদের মাধ্যমে যদি কারও জীবন বাঁচে সেটা অনেক বড় পাওয়া। করোনায় পরিবারের তিনজন আক্রান্ত থাকার এই কঠিন সময় যারা সহযোগিতা করেছেন, সাহস যুগিয়েছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি। 

উল্লেখ্য, রাজশাহীতে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ১২ এপ্রিল পুঠিয়া উপজেলায়। এরপর ১৫ মে রাজশাহী শহরে প্রথম শনাক্ত হন উম্মে কুলসুম। এ শহরে বর্তমানে শনাক্ত ৭৬ জন। এর মধ্যে ২১ জন মহানগরীর বাসিন্দা. তিনজন মারা গেছেন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ১৬ জন।


ইত্তেফাক/ইউবি