শিফারুল শেখ
করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, হংকংয়ে পোষা বিড়াল, নিউ ইয়র্কে বাঘ এবং নেদারল্যান্ডসে মিংকের (বেজির মতো দেখতে, কিছু সময় পানিতেও থাকে এই প্রাণী) দেহে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গবেষকরা এখন জানার চেষ্টা করছেন যে, কোন প্রাণী ভাইরাস ধরে রাখতে পারে এবং তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। মিংক থেকে করোনা ভাইরাসের (সারস-কভ-২) দুইটি সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। গবেষকরা বলছেন, অসুস্থ মানুষের চেয়ে প্রাণীর দেহ থেকে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি খুবই নগণ্য। তবুও গবেষকরা পোষা প্রাণী, পশু-পাখি এবং বন্যপ্রাণী থেকে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কতটা—তা দেখতে নমুনা সংগ্রহ করা প্রয়োজন বলে জানান। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অনুজীববিজ্ঞানী জোয়ানে সান্তিনি বলেন, কিছু প্রাণীতে ভাইরাস বিস্তারের তথ্য এখনো অজানা। পর্যাপ্ত তথ্য নেই। কিছু বিজ্ঞানী উদ্বিগ্ন যে, মানুষ এবং প্রাণীর মধ্যে এই ভাইরাসের আদান-প্রদান হতে পারে। নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেচট ইউনিভার্সিটির পশুবিষয়ক মহামারি বিশেষজ্ঞ অর্জন স্টেগম্যান বলেন, এটা হলে মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হবে। সেরকম কিছু যাতে ঘটতে না পারে—সেজন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রাণীর ঝুঁকি কতটা : প্রায় এক ডজন প্রাণী আছে যাদের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়। বিভিন্ন প্রাণী যেমন—পোষা বিড়াল ও কুকুর, আটক সিংহ ও বাঘ এবং মিংক মানুষের কাছ থেকে ভাইরাস গ্রহণ করতে পারে। তবে বিষয়টি কেউ পরীক্ষা করে দেখেননি বলে জানান কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির পশুদের জীবাণু বিশেষজ্ঞ জার্গেন রিচট। হামস্টার, খরগোশ এবং মারমোসেটসও সন্দেহের তালিকায় আছে। এরাও সংক্রমিত হয় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। শূকর, হাঁস এবং মুরগি এই তালিকায় নেই। কিন্তু এসব গোত্রের অন্য কোনো প্রাণী নিয়ে গবেষণা হয়নি। যেমন—গরু, হরিণ এবং ঘোড়ার কথা উল্লেখ করা যায়। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির ভাইরোলজিস্ট লিন্ডা সাইফ বলেন, যদি ভাইরাস বন্যপ্রাণী থেকে আসে তাহলে এসব প্রাণীর মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।
রিচট বলেন, গবেষণা করা দরকার যে, এক প্রাণী থেকে আরেক প্রাণীতে ভাইরাস বিস্তার লাভ করতে পারে কি না। যেমন বিড়াল, ফেরেটস, হ্যামস্টার্স-১ এবং হর্সশো বাদুড় সবাই ল্যাবরেটরিতে একই প্রজাতির প্রাণীগুলোতে করোনা ভাইরাসটি প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং ডাচ খামারগুলোর নিকটবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মিংক তাদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটিয়েছে। তাই বলে এসব প্রাণী মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে এমনটা বলা যায় না বলে উল্লেখ করেন সাইফ। জার্মানির রাইমসের ফেডারেল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজিস্ট মার্টিন বিয়ার বলেছেন, প্রাণীরা যে বিপুল পরিমাণে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয় এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই বিষয়ে তাদের ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
ভাইরাস ছড়ানোর জন্য সন্দেহের তির বাদুড়ের দিকেও। এই প্রাণী দলবেঁধে থাকে। তারা প্রায় কখনোই অসুস্থ হয় না, কিন্তু দূরদূরান্ত পর্যন্ত রোগের জীবাণু ছড়ায়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক কেইট জোনস বলেন, বাদুড় দীর্ঘক্ষণ ওড়ার ক্ষমতা রাখে এবং ডিএনএর ক্ষতি সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও অন্য পাখিদের চেয়ে তারা বেশি সক্ষম—এমন কিছু প্রমাণ তারা পেয়েছেন। হয়তো এর মাধ্যমে অনেক ভাইরাসের মধ্যে থেকেও তারা কম অসুস্থ হয়। কিন্তু এটি এখনপর্যন্ত ধারণামাত্র। ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের অধ্যাপক জোনাথন বল বলছেন, স্তন্যপায়ী প্রাণী হওয়ায় মানুষের মধ্যে সরাসরি অথবা মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কোনো প্রাণীর মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে বাদুড়। সন্দেহভাজন আরেকটি প্রাণী হচ্ছে প্যাঙ্গোলিন।
