করোনা রোগীদের বর্জ্যে নূতন বিপদ

আপডেট : ০৭ জুন ২০২০, ২১:৪৫

করোনা ভাইরাস লইয়া বিশ্বব্যাপী এত বেশি মাথাব্যথার প্রধান কারণ হইল—রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। সকল প্রকারের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের পরও বহু ক্ষেত্রে করোনার সংক্রমণ ঘটিতেছে। করোনার ব্যাপক প্রকোপ বৃদ্ধি পাইবার কারণে হাসপাতালগুলিতে নূতন রোগীর জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তিল ধারণের জায়গা নাই। এই জন্য বর্তমানে করোনায় সংক্রমিত রোগীদের উল্লেখযোগ্য অংশই বাড়িতে অবস্থান করিয়াই চিকিত্সা গ্রহণ করিতেছেন। যেহেতু রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে, সেই কারণে এই রোগে ব্যবহূত ওয়ানটাইম সুরক্ষাসামগ্রী এবং চিকিত্সা-বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা অত্যন্ত জরুরি। এমনিতেই বাংলাদেশে হয়তো এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ের সংক্রমণ ঘটে নাই। আশঙ্কা করা হইতেছে, আগামী কয়েক মাস পর এই সংক্রমণ পিক-এ উঠিবে। তখন এই রোগের চিকিত্সাবর্জ্য আরো বৃদ্ধি পাইবে। সেই ক্ষেত্রে বাড়িতে চিকিত্সাধীন করোনা রোগীদের ব্যবহূত সুরক্ষাসামগ্রীগুলি যাহাতে সাধারণ বর্জ্যের সহিত মিশিয়া না যায়, সেই ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা এখনই করিতে হইবে।

তবে উদ্বেগের কথা হইল, বাসাবাড়ি ছাড়াও হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতাল ছাড়া বাকিগুলি নিয়ম মানিয়া করোনা রোগীদের মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করিতেছে না। একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানা গিয়াছে, কেবল রাজধানী ঢাকা হইতেই গত মাসে প্রায় ২৫০ টন মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহ করা হইয়াছে। আর দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভসসহ এখনও পর্যন্ত প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হইয়াছে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টন। এই সময়ে ঢাকায় ১ হাজার ৩১৪ টন সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভস এবং সার্জিক্যাল মাস্কের ৪৪৭ টন বর্জ্য তৈরি হইয়াছে। ন্যূনতম সচেতনতা ছাড়াই এই সকল বর্জ্যের বড়ো একটি অংশ যত্রতত্র ফেলা হইতেছে! চট্টগ্রামেও একই অবস্থা। ইতিপূর্বে জানা গিয়াছে, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজসহ নগরে থাকা ৯০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ১৮৩টি প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি হইতে প্রতিদিন প্রায় ১০ টন মেডিক্যাল বর্জ্য বাহির হইতেছে। বর্জ্যগুলিকে জীবাণুমুক্ত করিতে চমেক হাসপাতালে দুইটি ইনসিনারেটর মেশিন (জীবাণুমুক্ত) থাকিলেও উহা অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকিবার অভিযোগ রহিয়াছে। এমনকি বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করিবার মতো দক্ষ জনবলও নাই। অথচ গত ১২ এপ্রিল করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি লইয়া জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহিত ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড রোগে ব্যবহূত পিপিই, মাস্ক ও  চিকিত্সা সরঞ্জামগুলি জীবাণুমুক্ত রাখা এবং এইগুলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিশেষ পদক্ষেপ লইতে নির্দেশ দিয়াছেন প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনকে। কিন্তু তাহা যেন বহুলাংশে কথার কথাই রহিয়াছে গিয়াছে!

এমনিতেই মেডিক্যাল বর্জ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি খুব বেশি। করোনা ভাইরাসের জন্য এখন এই ঝুঁকি আরো কয়েক গুণ অধিক। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী, হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ সকল চিকিত্সাপ্রতিষ্ঠানে মেডিক্যাল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের বিধান রহিয়াছে। বর্জ্য ফেলিবার আগে তাহা প্রথমে অটোক্লেভস বা ইটিপির মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করিবার কথাও বলা আছে। কিন্তু এই সকল বিধান যেন কাজির গরুর মতো—কেতাবে থাকে, বাস্তবে দেখা মিলে না। আমরা মনে করি, সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বাধ্যতামূলক মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপন করিবার এখনই সময়। এই ব্যাপারে কালক্ষেপণ কাম্য নহে।