দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
করোনা শুধু মানুষের মৃত্যু ঘটানোর জন্য আসেনি, মানুষকে সতর্ক করা ও শিক্ষা দেওয়ার জন্যও এসেছে। এই সত্যটাই, করোনা আসারও বহু আগে ইবসেন তার বিখ্যাত ‘এনেমি অব দ্য পিউপল’ নাটকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। মানুষ যখন অশিক্ষা, কুসংস্কারে ভোগে, প্রকৃতি-বিজ্ঞানের সত্যকে অস্বীকার করে অন্ধ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে অসত্যকে পূজা করে তখন প্রকৃতি মানুষের অন্ধত্ব ঘোচানোর জন্য সংহারমূর্তি ধারণ করে। গণবিরোধী শাসকশক্তিকেও প্রকৃতি সতর্ক বার্তা দেয়। যে শাসক সেই সতর্ক বার্তা উপেক্ষা করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার পতন হয়।
১৯৫৪ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) ফজলুল হক ও ভাসানীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে মন্ত্রিসভা গঠন করে। পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকেরা তুচ্ছ অজুহাতে সেই মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে। হক সাহেবকে গৃহবন্দি করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দি করা হয়।
১৯৫৫ সালেই পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম প্রদেশব্যাপী মহাপ্লাবন শুরু হয়, যে প্লাবনে ঢাকা শহর ডুবে গিয়েছিল। হক সাহেব তখন বন্দিত্ব দশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি ঢাকা শহরের বন্যাদুর্গত এলাকা দেখতে বেরিয়েছিলেন। কয়েক জন সাংবাদিক বন্ধুসহ শেরেবাংলার সঙ্গে আমিও ছিলাম। একটা ডিঙি নৌকায় দাঁড়িয়ে হক সাহেব ঢাকার একটি বন্যাপ্লাবিত এলাকা দেখছিলেন। বাড়িঘরে বন্যার পানি ঢোকায় মানুষজনের দুর্গতির অন্ত ছিল না। তা দেখে হক সাহেব একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘হায় আল্লাহ্! পাকিস্তানি শাসকদের দোষে তুমি বাংলার মানুষকে শাস্তি দিচ্ছ কেন?’
শেরেবাংলার এই আক্ষেপ শুনে মনে হতে পারে প্রকৃতি বুঝি শাসকদের শাস্তি না দিয়ে তাদের পাপের জন্য শাসিতদেরও শাস্তি দেন। না, শাসকেরাও শাস্তি পান। যেমন, ১৯৫৫ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে প্রদেশব্যাপী বন্যার পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকে মুসলিম লীগের চিরবিদায় ঘটেছিল। আরো সাম্প্রতিক কালে আসি। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল দ্বিতীয় সুপার পাওয়ার। এই শক্তি অকস্মাত্ ধসে পড়তে পারে— এ কথা স্বপ্নেও কেউ ভাবেনি। কিন্তু চেরনোবিলের আণবিক কেন্দ্রে হঠাত্ ঘটল একটি দুর্ঘটনা। দেখা গেল, এই একটি দুর্ঘটনাতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তির দুর্গ ভেঙে পড়েছে।
আফগান-যুদ্ধে জড়িত হয়ে প্রচুর রক্তপাত ঘটিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পোল্যান্ডের পোজন শহরে একটি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ হয়। এই বিক্ষোভ দমনের জন্য সোভিয়েত সৈন্য গুলি চালিয়ে ২৬ হাজার মানুষ হত্যা করে। সোভিয়েত শাসকদের অনাচার যখন চরমে, তখনই চেরনোবিলের দুর্ঘটনা ঘটে। ইয়েলিসনের মতো এক মদ্যপ মার্কিন সহায়তায় ক্ষমতা দখল করে।
ইতিহাসের এটা একটা বিস্ময়, যে কোনো জাতির যখন পতন ঘটে, তখন তার মাথায় একজন দুর্বল অথবা অনাচারী শাসক ক্ষমতায় বসে। মোগল সাম্রাজ্যে আওরঙ্গজেব ছিলেন স্ট্রংম্যান। তার আমলে মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছে। তারপর আর কোনো স্ট্রং মোগল সম্রাটের সন্ধান মেলে না। মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সাম্প্রতিককালে মদ্যপ ও মার্কিন তাঁবেদার ইয়েলিসনের শাসন আমলেই বিশ্বের দ্বিতীয় সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। বর্তমানের রাশিয়ায় পুতিনের মতো স্ট্রংম্যান ক্ষমতায় থাকাতেই দেশটি ধীরে ধীরে আবার মাথা তুলছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ভাঙনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ার। তার শক্তির দাপটের সামনে মাথা তোলে, এমন দেশ আর বিশ্বে নেই। মনে হয়েছিল আমেরিকার এই শক্তি অজর ও অমর। কিন্তু আবার দেখছি ইতিহাস ও প্রকৃতির খেলা। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের পর আমেরিকায় আর কোনো শক্তিশালী ও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসেনি। জর্জ বুশ জুনিয়র তো সারা বিশ্বে আমেরিকার নৈতিক নেতৃত্ব ধ্বংস করেছে। ট্রাম্প-প্রেসিডেন্সি মার্কিন সাম্রাজ্য শক্তির শবাধারে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিতে যাচ্ছে। এমন আকস্মিকভাবে পৃথিবীতে আমেরিকার শক্তি ও আধিপত্য বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।
একক সুপার পাওয়ার হওয়ার পর সারা বিশ্বে আমেরিকার অত্যাচারের অনাচারের কোনো তুলনা হয় না। আফগান যুদ্ধ থেকে অবৈধ গালফ যুদ্ধ পর্যন্ত আমেরিকা যত মানুষ হত্যা করেছে, তত মানুষ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও নিহত হয়নি। ট্রাম্প অনেকটা রাশিয়ান ইয়েলিসনের মতো। তিনি বর্ণবাদী ও স্বৈরাচারী। কিন্তু চরিত্রে ভীরু ও দুর্বল। শোনা যায়, বর্তমানে আমেরিকায় একজন অশ্বেতাঙ্গ হত্যার জন্য যে গণবিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে, তা ওয়াশিংটনে চলার সময় ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের ভূগর্ভস্থ বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মুখে হুংকার, চরিত্রে ভীরু—এই হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার আমলেই আমেরিকা করোনায় বিপর্যস্ত হয়েছে। এখন করোনার ছোবল না থামতেই সারা মার্কিন মুল্লুক জুড়ে গণ-অভ্যুত্থান। অনেকে আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই তার বহিরাগত ও বর্ণবিদ্বেষী নীতির দরুণ আমেরিকার জাতীয় ঐক্যে যে ভাঙন ধরিয়েছেন, তা সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের অন্তিম সময়ের ফাটলের মতো। যে বর্ণবিদ্বেষী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতির মাথায় চড়ে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন, আজ সেই নীতি তাকে সাপ হয়ে দংশন করতে চলেছে। ওঝা হয়ে কেউ তাকে রক্ষা করবে, এমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
পৃথিবীর সব দেশে এমনকি বাংলাদেশেও মানুষের অনাচার, বর্বরতা, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সন্ত্রাস এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর একটা প্রতীকার দরকার ছিল। দারুণভাবে স্ফীত জনসংখ্যা কমানো দরকার। ধরিত্রী এই ভার আর বহন করতে পারছে না। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেপরোয়াভাবে তো বাড়ছেই, তার ওপর মানুষের লোভ ও অত্যাচারে প্রকৃতি বিপদগ্রস্ত। ইচ্ছামতো নদী-খাল ভরাট করে বাড়িঘর, দোকানপাট বসানো হচ্ছে। গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলির সেই চমত্কার মাটির পাহাড় তো এখন নেই। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যার ওপর চলছে অত্যাচার। সুন্দরবনের টাইগার অব বেঙ্গলসহ বন্য জন্তু সব সাবাড়। বহু শতকের প্রাচীন গাছপালাগুলোও কাটা হচ্ছে। ভাওয়ালের গড় তো কবেই শেষ হয়ে গেছে।
সারা বিশ্বেও সমুদ্রের গভীরতা কমছে। তার ফলে বাড়ছে বন্যা, প্লাবন, ভূমিকম্প। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। জলবায়ু, আবহাওয়া দারুণভাবে বদলে যাচ্ছে। প্রকৃত মানুষের এই অনাচারের পরপর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ঝড়, বন্যা, সাইক্লোন, টাইফুন ইত্যাদি পরপর ঘটিয়ে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় অরণ্য এলাকায় অগ্নিঝড় চলেছে মাসের পর মাস। মৃত অগ্নিগিরিগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে। তবু আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর হুঁশ নেই। ট্রাম্প তো দারুণভাবে পরিবেশদূষণ থেকে পৃথিবীর আবহাওয়া রক্ষার শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে অনাগ্রহী। ছোটো দেশগুলোর হয়ে শেখ হাসিনা বৃহত্ শক্তির দুয়ারে বৃথাই মাথা কুটে মরছেন। মানুষের এই মূর্খতা, লোভ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাই সতর্কবার্তা নিয়ে করোনা এসেছে। এবার তার হামলা সারা বিশ্বে। হাজারে হাজারে মানুষ মরছে। তা যতই শোকাবহ হোক, জনসংখ্যা কমছে। পরিবেশ ও আবহাওয়া দূষণমুক্ত হচ্ছে। বড়ো বড়ো শহরে যানজট হ্রাস পাওয়ায় মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ছে। লকডাউন মানুষের মধ্যে মানবতাবোধ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি মানুষের মধ্যে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অভ্যাস তৈরি করছে। করোনা ‘ডেথ দ্য লেভেবারের’ মতো ধনী-গরিব, উচ্চ-নিচের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিচ্ছে। করোনা অবশ্যই মানবসমস্যার শত্রু। কিন্তু তার এবারের সতর্ক বার্তাকে মানুষ উপেক্ষা করলে করোনার পর যে ধ্বংসলীলা বিশ্বের বুকে নেমে আসবে তা হবে আরো ভয়ংকর, আরো মর্মন্তুদ।
করোনা তাড়াও—এই আন্দোলনের সঙ্গে করোনার হামলা থেকে শিক্ষা নাও—এই আন্দোলনটিও শুরু করা উচিত; বিশেষ করে, উন্নয়শীল দেশগুলোতে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়শীল দেশ। কিন্তু তার উন্নয়নের মধ্যে বহু ফাঁক রয়ে গেছে। করোনার হামলায় সেই ফাঁকগুলো ধরা পড়ছে। দেশের করোনা-পরবর্তী সামাজিক জীবনের পুনর্গঠনে, উন্নয়নের কর্মসূচি সম্পর্কে সরকারকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। বর্তমানে সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও আতঙ্কগ্রস্ত। পারস্পরিক দোষারোপে না গিয়ে আজ সকলেরই করোনা হটানো এবং করোনা-পরবর্তী সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের পুনর্গঠন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করা উচিত।
[ লন্ডন, ৬ জুন, শনিবার, ২০২০ ]
