বাজেট :প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

আপডেট : ০৭ জুন ২০২০, ২১:৪৭

হায়দার আহমদ খান, এফসিএ

বিশ্বে সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশ পরিচালনায় এসেছে পরিবর্তন। সরকার ব্যবস্থায় এসেছে বহুল আলোচিত এবং গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা। আবার সময়ের প্রয়োজনে গণতান্ত্রিক সরকারের কার্যাবলি দেশের জনগণের নিকট অধিক মঙ্গলজনক করার জন্য এসেছে বার্ষিক বাজেট। এক কথায় বছরের কার্যপরিধি। বাংলাদেশে এখন যেহেতু চলছে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা এবং বাংলাদেশে জুলাই-জুন হচ্ছে বার্ষিক হিসাব বছর সে কারণে সংসদে আগামী ২০২০-২১ হিসাব বছরের বাজেট উপস্থাপন হতে যাচ্ছে। সময়ের চাহিদায় বাজেট আসবে কিন্তু প্রয়োজনের চাহিদায় প্রধান বিবেচ্য বিষয় করোনা মহামারি। ২০১৯ সালের ডিসেম্ব মাসে চীনের উহান শহরে শুরু হয়ে গতকাল জুন মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত বিশ্বের ২১৩টি দেশ এবং টেরিটরিজে প্রায় ৭০ লাখ লোক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৪ লাখের বেশি মারা গিয়েছে। বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজারেরও বেশি এবং মারা গিয়েছেন ৮৮৮ জন। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশের সামনের কয় দিন বিপজ্জনক। সরকার এলাকাভিত্তিক লকডাউনের চিন্তা করছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার স্বার্থে।

বাংলাদেশে লকডাউন মার্চের শেষ সপ্তাহে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে মে মাসের ৩০ তারিখ। বিশ্বের অনেক দেশেই চলছে এখনো লকডাউন। লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ী সমাজ। আর ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত মানুষ। এদের মধ্যে যাদের সঞ্চয় কম তারা আছে মহাবিপদে। এক সংবাদে প্রকাশ, বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটির মতো মানুষের দৈনিক আয় ২ মার্কিন ডলারের কম অর্থাত্ ২০০ টাকার কম (সূত্র :দৈনিক ইত্তেফাক, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৯)। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় তাদের সঞ্চয়ের অবস্থা। সাধারণ মানুষের ধারণা, এদের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। এই বিশ্ব মহামারি করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হওয়ায় গরিবের দলে অধিক হারে দিন দিন মানুষ যোগ দিচ্ছে। এই অধিকসংখ্যক মানুষ খাদ্য জোগাড়ের সমস্যায়। বাংলাদেশের অবস্থা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ স্বরূপ।

লকডাউনের জন্য বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একদম বন্ধ বলা চলে। বিশ্ব অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষুদ্র-মাঝারি পর্যায়ে বলতে গেলে। ক্ষুদ্র-মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঞ্চয়ও বেশি থাকার কথা নয়। বাংলাদেশেও বর্তমানে তা-ই মনে হচ্ছে এবং সে কারণেই লকডাউনের সূচনায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দিতে হয়েছে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে। আরো অনেক প্রণোদনার প্রস্তাব বিবেচনায় আছে, সে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে এবং প্রয়োজনও আছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যায় ব্যবসায়ীর অবস্থা বিবেচনায়। ব্যবসায়ীর কাছে চলতি মূলধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ে বাকিতে বিক্রি করতে হয় এবং বাকিতে কেনাও যায়। এবং এ কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে একটি গ্রহণযোগ্য সূত্র, ব্যবসায়ে ১ টাকার চলতি দায় থাকলে ২ টাকার চলতি মূলধন রাখতে হবে। চলতি মূলধন বেশ কয়েকটি কম্পোন্যান্ট নিয়ে চলে যেমন, নগদ, স্টক এবং পাওনা। ব্যবসায়ে অনেক সূত্র আছে, যা মেনে চলতে পারলে সাধারণ সময়ে সমস্যা কম হয়। তার মধ্যে Cash Conversion Circle (CCC) একটি। ব্যবসায়ে ব্যবহার করার প্রত্যেকটি কম্পোন্যান্টের খরচ আছে যা ব্যবসায়ে বলা হয় Cost of Capital, Debt। যে ব্যবসায়ী এই বিষয়ে যত সজাগ তার মুনাফা তত বেশি। অবশ্যই স্বাভাবিক সময়ে এবং এ কারণেই ব্যবসায়ীরা হাতে বেশি নগদ রাখেন না বা সম্ভব হয় না। বর্তমান বিশ্বে করোনার মহামারিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের মতো বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানে ‘নগদ সহায়ক’ এই সম্পদ অবস্থার বিবেচনায় যা সবচেয়ে বেশি দুর্লভ। হঠাত্ মহামারি শুরু হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ের চলতি মূলধনের প্রধান উপাদান ‘নগদ’ সবচেয়ে আক্রান্ত। দেশের ব্যবসায়ের সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি-ব্যবসায়ে দেখা দিয়েছে মহামারি। বাংলাদেশ যেহেতু তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যবসায়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং পোশাক বাণিজ্য আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সে কারণেই বাংলাদেশের প্রধান ব্যবসায় খাত সমস্যার সন্মুখীন বেশি। এই অবস্থায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায় কর্মরতদের আয়-উপার্জনও হ্রাস পাচ্ছে, কর্মহীনও হচ্ছে অনেকে। এইমাত্র টেলিফোনে সংবাদ পেলাম, আমার খুই প্রিয় এক ব্যক্তি বাংলাদেশের একটি বড়ো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি আর করতে পারছেন না, তার অন্য একটি কর্মসংস্থানের দরকার। মনে মনে দোয়া করছি সবার জন্য, মহান আল্লাহ যেন আমাদের হেফাজত করেন।

বাংলাদেশের এমন একটি সময়ে আসছে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের দেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। দেশের সম্পদের তুলনায় রাজস্ব আহরণের একটি রেশিও আছে যাকে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বলা হয়। ট্যাক্স পরিশোধের হার এবং পরিমাণে যত বেশি হবে দেশের উন্নয়ন তত ভালো হবে। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ, বাংলাদেশে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৯.৩ শতাংশ (The Daily Star, 13/2/2020)। এখানে উল্লেখ্য, সবার মতামত অনুযায়ী উন্নয়নের জন্য ট্যাক্স-জিডিপি ১৫ শতাংশ উন্নয়নবান্ধব। বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের এমন অবস্থায় দেখা দিয়েছে করোনার মতো মহামারি। এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয়েছে সব কাজকর্ম বন্ধ রাখা। এমন অবস্থায় সরকারের রাজস্ব আহরণ অবশ্যই বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং হবে, যেহেতু লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা এখনো দেখা যাচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আহরণ হয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে। সমাজ যত উন্নয়শীল হয় প্রত্যক্ষ করের হার এবং পরিমাণ বেশি থাকে। বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ কর মানে আয়কর আসে মোট করের ৩৫ শতাংশ মাত্র। আর ৩৭ শতাংশ আসার কথা ভ্যাট নামক আইনের আওতায়। বাকি অংশ আহরিত হয় আমদানি এবং অন্যান্য সেবা বা দ্রব্য থেকে। ভ্যাটের মাধ্যমে আহরিত রাজস্ব যেহেতু সমাজের প্রায় সব দ্রব্য ও সেবা কেনাবেচার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং করোনার জন্য সমাজের কেনাবেচা যেহেতু প্রায় বন্ধ বা কম, সে কারণেই ভ্যাট আহরণও কম হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদায় এবং সরকারি কোষাগারে জমাও হবে না। আবার সরকারের রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হলেও রাজস্ব ব্যয় বন্ধ রাখা যায় না। মাঝে মাঝে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যেমন বর্তমান মহামারিতে। সরকারকে এমন অবস্থায় ঋণ নির্ভরশীল হতে হয়।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে আমাদের ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার মোট বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার ডেফিসিট দেখানো ছিল। সময়ের চাহিদায় যা এখন অবশ্যই বাড়বে। ডেফিসিটের ৭৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা স্থানীয় উত্স থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যদি সরকার স্থানীয় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে ব্যবসায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; কারণ ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার একটি মাত্রা ও পরিমাণ আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা আনুযায়ী। ব্যাংক যেমন ইচ্ছা করলেই আমানত বাড়াতে পারে না তেমনি ইচ্ছামতো ঋণও দিতে পারে না। সমাজের সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেহেতু স্থবির সে কারণেই সরকারের দায়িত্ব হবে রাজস্ব আহরণকে গুরুত্ব কম দিয়ে সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখা। সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থিতিশীল এবং সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী চালানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময় সময় প্রচলিত নিয়ম-নীতির পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংশোধন করে থাকে। এই ক্ষেত্রে বর্তমানে হয়তো একটু বেশি কাজ করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। দেশের অধিকাংশ মানুষের স্বার্থে প্রয়োজনে তা ব্যতিক্রমও হতে পারে। এই ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা যত বেশি থাকবে তত সমালোচনা কম হবে, সরকারের বাস্তবায়নের ইউনিটসমূহ সুন্দরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারবে। অর্থাত্ সরকারের সিদ্ধান্ত হতে হবে ইনক্লুসিভ (Inclusive)। আসছে বাজেটে যত না রাজস্ব আহরণের লক্ষ বা উদ্দেশ্য থাকবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বর্তমান ব্যবসায়, কর্মহীনতায়। এক কথায় মানুষের উপার্জন সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার সৌভাগ্য যেহেতু আমার আছে, সে কারণেই আমার পূর্ণ আস্থাও আছে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি বাজেট আসবে এবং ব্যবসায়ের বর্তমান মন্দায় ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় চালিয়ে যেতে পারবেন। এই মুহূর্তে বিশ্ব মহামারিতে যেমন বাংলাদেশের জীবনহানি কম তেমনি কম ক্ষতিতে আমরাই আগামী দিনে সমাজ উন্নয়নে শরিক থাকব ইনশাআল্লাহ। বর্তমান বাংলাদেশে যে অবস্থা চলছে তা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের নীতিমালা এবং কর্মপদ্ধতি হতে হবে জরুরি অবস্থা ব্যবস্থাপনায় যুদ্ধকালীন নীতি গ্রহণের মতো। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ২০২০ সালের সমস্যায় ১৯৭১ সালের জাতীয় সমস্যার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই। আমার স্থির বিশ্বাস, আমরা বিজয়ী হবই হব, ইনশাআল্লাহ।

n লেখক :সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ