খ্রিষ্টীয় পুরাতন বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ববাসী। আমরা বাংলাদেশের মানুষও এবার একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বছরে পা দিয়েছি। ৩০ ডিসেম্বর একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়েছে। আমরা এটাকে একটি বাঁক বদলের নির্বাচন বলছি। কারণ এই নির্বাচনে জয়-পরাজয় কেবল একটি দল বা জোটের ক্ষমতায় থাকা না-থাকার প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজনৈতিক আদর্শিক জায়গায়। সাদা চোখে এই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিযোগিতা মনে হলেও এর রাজনৈতিক গভীরতা ছিল আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একটি ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছে, বিএনপি আর একটি ধারার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে উহ্য রেখেই বিএনপি জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা আসলে রাজনীতির কোন ধারার প্রতিনিধি। এবারের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছিল বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা এটাই। অন্য বিষয়গুলোতে পরে আসছি।
নির্বাচন সাধারণত আমাদের দেশে শতভাগ শান্তিপূর্ণ হয় না। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়। তারপরও এবার নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে সহিংসতা ছিল কম। বিভিন্ন স্থানে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। নির্বাচনের আগে থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ বিএনপির পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল প্রত্যাশিত, কাঙ্ক্ষিত। তবে বিএনপিকে যে মানুষ এভাবে খারিজ করবে সেটা ছিল কিছুটা অভাবিত। নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে কিছু বলার আগে জেনে নেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী বলছেন জয়ের ব্যাপারে। তিনি বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের সামনে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়ের প্রধান কারণ ছিল গত দশ বছরে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা, জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন এবং জিডিপি বৃদ্ধি করা। জনগণ সরকারের ধারাবাহিকতা চেয়েছিল, উন্নয়ন চেয়েছিল। যে-কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের ভোট দিয়েছে’।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে যোগ করার বিষয় এটুকুই যে, মানুষ বিএনপির নীতিহীন এবং নেতিবাচক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আওয়ামী লীগের উন্নয়নের রাজনীতিকে গ্রহণ করেছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল বিএনপির। তারা যেন কিসের আশার আসায় বসে ছিল। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন নয়, এসব বড় বড় কথা বলে মানুষের কাছে এক ধরনের নেতিবাচক বার্তাই দিয়েছিল বিএনপি। বিএনপির প্রধান দুই নীতি-নির্ধারক নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতি দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সমস্যা তৈরি করেছে। সিনিয়র নেতাদের মধ্যে মতবিরোধের বিষয়টি গোপন নয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে এবং জামায়াতের সঙ্গে মিলে নাশকতা-সহিংসতা চালিয়ে বিএনপি বিগত কয়েক বছরে মূলত একটি গণবিচ্ছিন্ন শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিএনপির একটি বড় সমর্থকগোষ্ঠী আছে। তবে তারা অসংগঠিত এবং আন্দোলনবিমুখ। তাই বিএনপি সরকারের ওপর কখনোই আন্দোলনের চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু সারাক্ষণ আন্দোলনের কথা বলে এসেছে। রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে বিএনপি মাঠের বাস্তবতার দিকে নজর না দিয়ে কিছু অনুমাননির্ভর ধারণার ওপর ভিত্তি করেছে।
বিএনপির সবচেয়ে বড় ভুল এটাই যে, তারা ধরেই নিয়েছিল, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায় এবং সেটা বিএনপির অনুকূলে। আওয়ামী লীগের যে একটি গণভিত্তি এবং জনসমর্থন আছে, এটা বিএনপি বিবেচনায় না নিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তাকে বাড়িয়ে ভেবেছে। ফলে তারা কৌশল নির্ধারণে ভুল করেছে। নির্বাচনের জন্য একটি প্রস্তুতি লাগে। বিএনপির তা ছিল না। তাদের সব নির্বাচনী পদক্ষেপই ছিল দায়সারা। নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের নিবন্ধন বাতিল হবে, তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিকল্প ছিল না। কিন্তু নির্বাচনে জেতার জন্য যা যা করা দরকার বিএনপি তার কিছুই করেনি। হেলাফেলা করে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানের পছন্দের প্রার্থীরা মনোনয়ন পেয়েছেন, মাঠের প্রকৃত জনপ্রিয় প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। মনোনয়ন ঘোষণার পর বিক্ষোভ-অসন্তোষ ছিল নজরে পড়ার মতো। ব্যাপক মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এর ওপর ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোটের জন্য আসন ছাড়তে গিয়ে বিএনপির অনেক যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়েছেন। ফ্রন্ট ও জোট এবার বিএনপির ভোট না বাড়িয়ে কমিয়েছে। এমনকি দলের সমর্থকরাও নিরুত্সাহিত হয়েছেন। তাদের নির্বাচনী প্রচারণাও সুপরিকল্পিত ও সুসমন্বিত ছিল না। নানা রকম গুজব ছড়িয়ে তারা সুফল পেতে চেয়েছে। কিন্তু মানুষের কাছে প্রকৃত তথ্য বা খবর এতো দ্রুত পৌঁছে যায় যে গুজব ছড়িয়ে আর কাউকে বিভ্রান্ত করা সহজ কাজ নয়।
সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত বিরোধিতা ছিল এতোদিন বিএনপির নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি বড় হাতিয়ার। কিন্তু এবার নির্বাচনে এই হাতিয়ারের যথেচ্ছ ব্যবহার করা যায়নি। একদিকে কামাল হোসেনদের সঙ্গে ঐক্য, অন্যদিকে ভারতের সহানুভূতি লাভের আশা এবার বিএনপিকে সাম্প্রদায়িক ও ভারতবিরোধী প্রচারণা থেকে বিরত রেখেছে। কিন্তু বিএনপির ‘সলিড’ ভোটাররা এতে আশাহত হয়েছে। তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে উত্সাহ হারিয়েছে।
জামায়াতবিরোধী একটি সেন্টিমেন্ট যে নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে, সেটাও বিএনপি নেতৃত্ব বুঝতে পারেননি বা বুঝতে চাননি। গণজাগরণ মঞ্চের অভ্যুদয়ের বিষয়টিও তারা বিবেচনায় নেওয়ার গরজ বোধ করেননি। এবার বিএনপির সামনে সুযোগ ছিল জামায়াতকে জোট থেকে বাদ দেওয়ার। বিএনপির আনুকূল্য না পেলে জামায়াত নির্বাচন করতে পারতো না দলীয় পরিচয়ে। কিন্তু জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে বিএনপি এবার এটা প্রমাণ করেছে যে জামায়াত তাদের কৌশলের নয়, আদর্শেরই মিত্র। সাধারণ মানুষকে বিষয়টি উদ্বুদ্ধ করেনি।
সব মিলিয়েই বিএনপির এই ভোট বিপর্যয়। সমর্থক ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত না করে বিএনপি নির্ভর করেছে ভোট বিপ্লবের গায়েবি আওয়াজে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে টানা দশ বছর ধরে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সরাসরি ভোগকারী মানুষের সংখ্যাও দেশে কয়েক কোটি। যারা এই সরকারের সময় নানাভাবে উপকৃত হয়েছেন তারা যে সরকারবিরোধী ভোট বিপ্লবে অংশ নেবে না— এই স্বাভাবিক বোধটুকুও বিএনপি হারিয়েছিল। তাই তাদের হতাশ হতে হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকেই সারাদেশে এই প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যাই হোক না কেন আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় ফিরবে। এই প্রচারণা বিএনপি সমর্থকদের হতোদ্যম করেছে। তারা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়েছে। যারা কেন্দ্রে গিয়েছেন তারা ভোট দিতে পেরেছেন। না গিয়ে যারা অভিযোগ করছেন তাদের কথা আলাদা। ভোট বিপ্লব হয়েছে এবং সেটা আওয়ামী লীগের পক্ষে।
এখন ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর আবারও বিএনপিকে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষ ৩০ ডিসেম্বরের ভোটের ফলাফল মেনে নিয়েছেন হূষ্টচিত্তে। কোথাও কোনো অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ নেই। যারা ভোট দিতে গিয়েছেন তারা ভোট দিতে পেরেছেন বলেই তাদের মনে কোনো ক্ষোভ-অসন্তোষ নেই। কিন্তু বিএনপি ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। পুনর্নির্বাচনের দাবি করেছে। সেজন্য তারা আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে। আইনি ব্যবস্থা নেবে। অথচ এই দুই ক্ষেত্রেই বিএনপির অতীত রেকর্ড ভালো নয়। তাদের আন্দোলনের ক্ষমতা নেই। তাদের ডাকে মানুষ আন্দোলনে নামে না। বিএনপি আন্দোলনের দল নয়। আইনি লড়াইয়েও তারা সুবিধা করতে পারে না। কারণ তাদের অভিযোগের আইনি ভিত্তিও দুর্বল। ‘ভোট ডাকাতির’ তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই কেবল সুফল পাওয়া সম্ভব। কয়েকটি জায়গায় যদি কিছু অনিয়ম হয়েও থাকে তাহলেও সামগ্রিক ফলাফলে তার প্রভাব সীমিত। নির্বাচন বাতিল হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। অসম্ভবের পেছনে না ছুটে বিএনপির উচিত হবে বাস্তবের কঠিন মাটিতে পা রাখা। সরকারের মুখোমুখি লড়ার ক্ষমতা অর্জনের আগে একটি ওয়ার্কিং রিলেশন তৈরি করাই শ্রেয়। খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান দৃশ্যপটে নেই। বিএনপিকে নতুন করে পুনর্গঠনেরও এখনই উপযুক্ত সময়। নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে কীভাবে রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, সরকারকে ঠিকপথে পরিচালিত করা যায়, সে উপায় খুঁজতে হবে বিএনপিকে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ালে মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে। মানুষ ন্যায়-অন্যায়ের তফাত্ ঠিকই বোঝে।
n লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
