একাদশ জাতীয় নির্বাচন ফলাফলের গেজেট এ সপ্তাহের মধ্যেই প্রকাশ হবে আশা করা যায়। তবে মন্ত্রিদের শপথ, সংসদ সদস্যদের শপথ এবং সরকার গঠনসহ রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করতে প্রায় ৭/৮ দিন লাগতে পারে। আশার কথা হলো, এবারের নির্বাচনে ভোটাররা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলেন। কেননা, এতো বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ দেখেনি আগে। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর আগে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এদেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিল, ছিনিয়ে এনেছিল চূড়ান্ত বিজয়। বন্যাসহ চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল তখন। আজ ৪৮ বছর পর ২০১৮ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেল তারই প্রতিচ্ছবি। এ জয় নিয়ে সমালোচকদের কানাঘুষা থাকলেও এসবের বাস্তব উপযোগিতা নেই বিন্দুমাত্র। এখন হিসাবটা সামনে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। মহাজোটের কাঁধে এখন বিশাল দায়িত্ব। মানুষ বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে মহাজোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। নানা শ্রেণির নানা বয়সের বিভিন্ন পেশার ছোট-বড় অসংখ্য স্বপ্নের প্রতিফলন এবারের নির্বাচন। সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়— বিশাল জয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতা আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়, সেটা যেন না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এ দেশের জনগণ তথা তরুণরা শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে নৌকা মার্কায় রায় দিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা— নতুন সরকার তাদের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকবেন।
২০০৮ সালে সম্পন্ন নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা। আওয়ামী লীগ পায় ২৩০টি আসন, বিপরীতে বিএনপি-জামায়াত পায় ৩০টি আসন। এরপর শেখ হাসিনা দেশকে নিয়ে যান অনন্য এক উচ্চতায়, যা ছিল জাতির জন্য কল্পনাতীত। দেশজ সম্পদ, মাথাপিছু আয়, শিল্প-কৃষি ও সেবা খাতের উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মহাকাশ বিজয়, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, ছিটমহল সমস্যা, যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিশ্বে রোল মডেল হয়ে উঠেন শেখ হাসিনা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত সারা দেশে মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতি শুরু করে। জনগণের মনে ভয়, আতঙ্ক জন্ম দিয়ে জয়ী হতে চেয়েছিল জোট। কিন্তু এদেশের মানুষ তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুনরূপে শুরু হয় উন্নয়নের কাজ। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশাল এক অর্জন পায় মহাজোট। যার ফলশ্রুতিতে এবার নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট। এতো চড়াই-উতরাইয়ের পরও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছে সরকার। এদেশের জনগণও তাই পুনঃনির্বাচিত করেছে শেখ হাসিনাকে। কারণ, জনগণ মনে করে একমাত্র শেখ হাসিনাই পারে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে। একটি সমৃদ্ধশালী, প্রযুক্তিবান্ধব, আত্মমর্যাদাশীল জাতি গড়তে।
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে— তা দেশের জনগণকে আরো বেশি আস্থাশীল করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি। গ্রামগুলোতে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেয়া, তরুণদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে— তা সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় আগামীর স্বপ্নে ভাসিয়েছে জনতাকে। আমাদের বন্ধু, সুহূদ শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকের সঙ্গে গতকাল কথা হলো, সবার চাওয়া একটিই— মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে আগে। সুশাসনের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোরতর হতে হবে। সন্ত্রাস, মাদক নির্মূল ও রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধাবাদীরা যেন জনগণের ভরসায় চিড় ধরাতে না পারে। দলের ত্যাগী, প্রকৃত কর্মীরা যেন নিরাশ না হয় সেদিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিপুল ভোটের মাধ্যমে জনগণ যে আমানত শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিয়েছে তার সঠিক প্রয়োগ যেন হয়। সরকার পরিচালনায় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে একটি বিশেষ টিম গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। গত সেপ্টেম্বরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে জরুরি সেবা প্রদানের চিন্তাটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক, সময়োপযোগী। ত্বরিত ফলাফল ও দোরগোড়ায় সেবা পেতে এ ধরনের আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে জনগণকে। তাদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তা সমাধান বা পরিত্রাণের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে দায়িত্বশীল ভূমিকাই সকলের কাম্য। স্বচ্ছতা ও সুনিশ্চিত জবাবদিহিতার মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। বাঙালি স্বপ্নবান জাতি, তাদের স্বপ্নের কাণ্ডারি এখন শেখ হাসিনা। তাই সকল আবদার, প্রত্যাশা শেখ হাসিনাকে ঘিরেই। এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আপনাকে নিয়ে যাবে মহাকালের চূড়ায়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রূপ আপনি দিবেন এটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
n লেখক: অধ্যাপক, গবেষক ও কলামিস্ট
