লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের আটকে রেখে স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নেওয়া হতো। মুক্তিপণের এই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে লিবিয়া পাচারকারী চক্রের হাতে যেত। ঐ চক্র হুন্ডিতে পাওয়া অর্থের একটি অংশ সিরিয়া ও লিবিয়ায় আইএসের যুদ্ধফান্ডে জমা দিত। গত শনিবার রাতে রাজধানীর কমলাপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া সুজনের কাছ থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এমনই তথ্য পেয়েছে। এর আগে শুক্রবার রাতে সুজনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন লিবিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ হওয়া ইছার উদ্দিনের স্ত্রীর বড়ো ভাই মোহাম্মদ আলী। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, লিবিয়াতে নির্যাতনকারী সজীব তাদের বলেছে, ‘সব টাকা দিবি। মুক্তিপণের টাকা আমরা একা খাই না। সিরিয়া ও লিবিয়াতে অংশগ্রহণকারী ধর্মযোদ্ধা, মিলিশিয়া ও আইএসদের এই টাকার ভাগ দিতে হয়। তাদের নির্দেশে আমরা কাজ করি।’
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (পশ্চিম) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহাদাত হোসেন সুমা বলেন, মানবপাচারকারী এই চক্রটি ইছার উদ্দিনসহ ভৈরবের সজল ও বিজয় নামে তিন জনকে লিবিয়া পাঠিয়েছিল। তাদের মধ্যে দুই জন নিখোঁজ রয়েছেন। এক জনকে মানবপাচারকারী চক্রের টর্চার সেল থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এই চক্রটি সুকৌশলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় মানবপাচার করে আসছিল। এদের আরো কয়েকজন সহযোগীকে ধরতে ডিবি পুলিশের অভিযান চলছে।
মামলার বাদী মোহাম্মদ আলী জানান, কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানাধীন হযরত আলী, তার ছেলে সজীব, সুজন ও সঞ্জিত মিলে ইছারকে লিবিয়া পাঠায়। তাদের সঙ্গে একই এলাকার জাফর, মামুন, শাকিল ও কাউছার বিদেশে মানব পাচার করে থাকে। জাফর ও সজীব আগে লিবিয়ায় থাকতো। সেখান থেকে দেশে ফিরে লোকজনকে অনেক টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত বছরের নভেম্বর মাসে লিবিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ইছার উদ্দিনকে চট্টগ্রাম থেকে দুবাই হয়ে লিবিয়া নিয়ে যায়। লিবিয়াতে নিয়ে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য অন্যদের সঙ্গে ইছারকেও নির্মম নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে দ্রুত মুক্তিপণ পরিশোধ করতে বলে। তা না হলে ইছারকে হত্যা করা হবে বলে জানানো হয়।
চক্রটি লিবিয়া নিয়ে টর্চার সেলে আটকে রেখে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে। মুক্তিপণের টাকা সেখানে আইএসকেও দেওয়া হতো।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, মানবপাচারে জড়িত বেশ কয়েকটি চক্র রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ পাচার করে আটকে রাখে। পরে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। এসব চক্রের গডফাদার ও সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হবে।
লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যার ঘটনায় গত ১ জুন পল্টন থানায় এবং ৪ জুন পল্টন ও বনানী থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ৮৭ জনকে আসামি করে মোট তিনটি মামলা দায়ের হয়। তেজগাঁও থানায় দায়ের করা মামলাসহ চার মামলায় এখন পর্যন্ত হাজি কামালসহ ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
