কোভিড-১৯ মহামারি গত কয়েক মাস যাবত্ অপ্রতিরোধ্য গতিতে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে সারা বিশ্বে। ইতিমধ্যে অসংখ্য মানুষ এই করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে। দেশে দেশে চলছে লকডাউন। একই সঙ্গে চলছে ভাইরাসটি দ্রুত শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া। চিকিত্সাব্যবস্থায় যোগ হচ্ছে নিত্য-নতুন ওষুধ ও কৌশল; কিন্তু কিছুতেই যেন বশ মানছে না পরিবর্তনশীল এই আরএনএ ভাইরাসটি। বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ বলছেন, এই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি প্রায় ২০০ বার পৌনঃপুনিক পরিবর্তিত হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন এর চেয়ে অনেক বেশিবার ভাইরাসটি তার জিনগত কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সলিডারিটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিনের মানবদেহের ওপর ট্রায়াল বা পরীক্ষা চলছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা প্রাথমিকভাবে সফল দাবি করা হলেও চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে এগুলো কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে এখনো অনেকেই সন্দিহান। কবে নাগাদ এই ভ্যাকসিনগুলো মানুষ ব্যবহার করতে পারবে সেই বিষয়েও বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারছেন না। উল্লেখ্য, সলিডারিটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে প্রায় ১০০টি দেশের বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের সহযোগে পরিচালিত ফার্স্ট ট্র্যাক রুয়ান্ডমাইজড ট্রায়াল যার দ্বারা দ্রুত কোনো ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা যায় এবং দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিন তৈরির পথ খুলে যায়। এই ট্রায়ালটি প্রথাগত ট্রায়ালের তুলনায় ৮০ ভাগ দ্রুততর বলে মনে করা হয়।
বিভিন্ন দেশে চলছে লকডাউন। কিন্তু দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে এক মহাবিপর্যয়। বিশ্ব জুড়ে ইতিমধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন আরো কোটি কোটি মানুষ। জীবন ও জীবিকা দুটোই অপরিহার্য এবং একটি অন্যটির পরিপূরক। এই কঠিন সত্যের মুখোমুখি আজ মানবসভ্যতা। ঘরে বসে থাকলে হয়তো করোনা থেকে বাঁচতে পারবেন; কিন্তু জীবিকার কী হবে! কাজ না করলে বা না থাকলে তো জীবন বাঁচানো এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়বে। এই কঠিন বাস্তবতা মেনে নিয়ে এখন প্রায় সব দেশেই শিথিল হচ্ছে লকডাউন। বিজ্ঞানীদের অনেকে লকডাউন শিথিল করার বিপক্ষে। তবে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য পর্যায়ক্রমে লকডাউন শিথিল করার জন্য বিশ্ব জুড়ে ইতিমধ্যেই বেশ জনমত গড়ে উঠেছে; কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, এই লকডাউন শিথিল করার পূর্বে অবশ্যই করোনা ভাইরাস সংক্রমণ কোন পর্যায়ে রয়েছে তা আমাদের জানতে হবে। অর্থাত্ সংক্রমণটি কি এখনো জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না—তা অবশ্যই জ্ঞাত হতে হবে।
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। শুরুতে আমাদের দেশে সংক্রমণের মাত্রা খুব একটা বেশি ছিল না; কিন্তু এপ্রিল মাস থেকে সংক্রমণ প্রায় জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করে। এই ধারা এখনো বিদ্যমান। টেস্টের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানো হলেও এখনো পর্যাপ্তসংখ্যক টেস্ট হচ্ছে না বলে বিষেশজ্ঞরা মনে করছেন। তাছাড়া করোনা রোগীকে অনুসরণ করা ও প্রয়োজনবোধে আলাদা করে রাখার জন্য আইসোলেশন সেন্টারও খুবই সীমিত এবং ব্যবস্থাপনায়ও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। তবে চিকিত্সার মান ও সেবা বাড়ানোর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যা প্রশংসার দাবিদার। চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও অন্যান্য মানুষ যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা মানবসেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রায় তিন মাস হতে চলল আমাদের জনগোষ্ঠীর মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে। এখন উপসর্গহীন অনেক মানুষের দেহে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে এবং অনেকেই এই ভাইরাস নিয়ে সাবলীল জীবনযাপন করছেন। তার মানে হচ্ছে—এই সমস্ত লোকের মধ্যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে। কত সংখ্যক লোক ইতিমধ্যেই কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জন করেছেন তা জানার জন্য এখন থেকেই অ্যান্টিবডি টেস্ট শুরু করা উচিত। এখন যে আরটি-পিসিআর (RT-PCR) পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে শুধু ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করা যায়; কিন্তু অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে কি না—তা জানা যায়। সাধারণত দুই ধরনের প্রোটিন-আইজিএম (IGM) ও আইজিজি (IGG) প্রতিরোধ ক্ষমতার নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করে। সংক্রমণের প্রথম দিকে আইজিএম থাকে এবং সংক্রমিত রোগী সুস্থ হয়ে গেলে তার দেহে প্রতিরোধক্ষমতা হিসেবে আইজিজি থাকে। যদিও অনেক ধরনের অ্যান্টিবডি টেস্ট রয়েছে তবে এই টেস্টগুলো অত্যন্ত সহজে, কম খরচে ও অল্প সময়ে করা সম্ভব।
ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় ইতিমধ্যেই অ্যান্টিবডি টেস্টের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ইংল্যান্ডের রোচে (Roche) কোম্পানির তৈরি অ্যান্টিবডি টেস্ট কিট ও আমেরিকার অ্যাবট ল্যাবরেটরিজের (Abbott Laboratories) তৈরি কিটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আমেরিকায় সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল (সিডিসি) আরো কিছু কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখছে। বাজারে অনেক ধরনের অ্যান্টিবডি কিট রয়েছে। তবে সবগুলোর গুণমান ও কার্যকারিতা এক নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্টতা ও কার্যকারিতা যাচাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিডিসির ভাষ্যমতে—তাদের ছাড়পত্র পাওয়া কিটগুলোর নির্দিষ্টতা ও কার্যকারিতা যথাক্রমে ৯৯ শতাংশ ও ৯৬ শতাংশ।
অ্যান্টিবডি কিট দিয়ে সংক্রমণের এক থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই যে কোনো ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধক্ষমতার একটি ধারণা পাওয়া যাবে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। বাংলাদেশে চিকিত্সকরা প্লাজমা থেরাপির সাফল্যের কথা বলেছেন। যে সমস্ত রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন তাদের ব্লাড প্লাজমা বা রক্তরস অর্থাত্ যাদের মধ্যে অ্যান্টিবডি আছে তা দিয়ে প্রায় মরণাপন্ন রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব বলে চিকিত্সকরা দাবি করেছেন। তাই প্লাজমা ডোনার বা রক্তদাতাদের সন্ধান করতে হলেও অ্যান্টিবডি টেস্টের বিকল্প নেই। অনেক দেশে যাদের রক্তে অ্যান্টিবডি পাওয়া যাচ্ছে তাদেরকে ইমিউনিটি পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এতে আপত্তি রয়েছে। ইমিউনিটি পাসপোর্ট হচ্ছে যাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তথা অ্যান্টিবডি আছে শুধু তাদেরকেই কাজেকর্মে যোগ দেওয়ার অনুমতিপত্র। তবে অ্যান্টিবডি কিট ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই এদের গুণমান ও কার্যকারিতা পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হবে এবং যথাযথ বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি ছাড়া কোনো প্রকার কিট ব্যবহার করতে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে সবদিক থেকে গুণমান যাচাই ও রক্ষা করে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অ্যান্টিবডি টেস্টের অনুমতি দেওয়া হলে গণহারে করোনা টেস্টের ওপরে চাপ কমানো সম্ভব হবে। এছাড়াও এই টেস্টের মাধ্যমে আমাদের জনগণের কোভিড-১৯ প্রতিরোধক্ষমতা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
n লেখক :অধ্যাপক, অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
