একবার চিন্তা করে দেখুন তো, কতটা নিচে নামলে মানুষের মতো দেখতে একটা দ্বিপদী প্রাণীকে অমানুষের কাতারে ফেলাটাও দায় হয়ে দাঁড়ায়? কতটা বিবেকবর্জিত হলে ক্ষুধায় কাতর কোনো ক্ষুধার্ত মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়? কী পরিমাণ নিকৃষ্ট হলে নিজের রিপুর তাড়নায় অবুঝ শিশুকে ধর্ষণ করে মাটিতে জীবন্ত কবর দিতে আমাদের আত্মা কেঁপে ওঠে না? এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? এটা কি মনুষ্য সমাজ, নাকি আমরা পরিবেষ্টিত হয়ে আছি শ্বাপদসংকুল পরিবেশে? এখন আর নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে গর্বিত বোধ হয় না। কারণ, মানুষ যেন মেতে উঠেছে অমানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায়। এখন কাউকে বিশ্বাস করা বারণ, কারণ অবিকল মানুষরূপী কিন্তু হায়না বা নেকড়ের চাইতেও ভয়ংকর মানসিকতাসম্পন্ন প্রাণীগুলো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে।
মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ, কিন্তু বিশ্বাসের মূল্যায়ন যদি হয় জীবনের প্রতিদানে, তাহলে বিশ্বাসহীনতা আর যা-ই হোক, পাপ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কেরালার সেই গর্ভবতী মা-হাতিটার জন্য আজ খুব কষ্ট অনুভব করছি, যে কিনা মানুষকে বিশ্বাস করে তাদের দেওয়া আনারস খেয়েছিল। হয়তো সে খুব ক্ষুধার্ত ছিল, তাই মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্যের অবকাশ তার মধ্যে ছিল না। সে কি জানত, মানুষরূপী কিছু হিংস্র দানব কী ভয়াবহ কাজটি করতে যাচ্ছে তার আর তার অনাগত সন্তানের সঙ্গে? সে কি একবারের জন্যও বুঝতে পেরেছিল ক্ষণিকের হাস্যরসের জন্য ক্ষুধার আহারে গেঁথে দেওয়া বাজির অস্তিত্ব? মা-হাতিটি না বুঝলেও মানুষ হিসেবে আজ আমাদের মাথা ভূলুণ্ঠিত। নিজেকে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে দাবি করার যৌক্তিকতাটা মনে হয় আর রইল না। যেদিন আসবে মহাপ্রলয়ের দিন, ধ্বংস হবে পৃথিবী, শুরু হবে শেষ বিচার, যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি জিজ্ঞাসিত হবে স্বীয় কৃতকর্মের জন্য, সেদিন কি এই বোবা প্রাণীটির নির্বাক হাহাকার, জর্জ ফ্লয়েড বা এলান কুর্দির বেঁচে থাকার আহাজারি আর সিরিয়ার হাজার হাজার নিরাপরাধ শিশুর আর্তনাদে খোদার আরশ কেঁপে উঠবে না?
অবশ্য যে বিশ্বে এখনো জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ওপর ভিত্তি করে চলে নির্বিচার মানুষ হত্যা, করোনার মতো মহামারির কাছে হেরে যায় পারিবারিক স্নেহ, বন্ধন, মনুষ্যত্ববোধ, যেখানে এখনো নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার জন্য করে যেতে হয় প্রতিনিয়ত লড়াই, লকডাউনের বিষয়টি বাড়িয়ে তোলে নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা, মহাদুর্যোগের সময় যেখানে কতিপয় ব্যক্তিবর্গের জন্য হয়ে ওঠে মুনাফা লাভের মোক্ষম সুযোগ, যে দেশে নারীকে ছোটো করে দেখানোর অপচেষ্টায় ব্যবহার করা হয় ‘মেয়ে মানুষের বুদ্ধি!’ জাতীয় অবমাননামূলক কথা, সেখানে একটা বোবা প্রাণীর জীবনের মূল্য নিয়ে কথা বলার মতো বড়ো প্রহসন আর নাই।
আর তাই মানুষ কি এখন পশু বা তার চাইতে নিকৃষ্ট প্রজাতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, সেটিই একটি বড়ো প্রশ্ন।
আইয়ামেজাহিলিয়াতের সময়টা আমরা দেখি নাই। পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, সে ছিল এক অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে, একবিংশ শতাব্দীর যে সময়টা আমরা এখন পার করছি, আইয়ামেজাহিলিয়াতের সময়টা কি এর চাইতেও অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল? নাকি শিল্পায়ন আর প্রযুক্তিগত উত্কর্ষের ঝলকে আমাদের সব ইন্দ্রিয় আজ এতটাই মোহাবিষ্ট যে আলো আর আঁধারের পার্থক্যটুকু বোঝার সামর্থ্যটা পর্যন্ত হারিয়েছি।
পরিশেষে বলব, মানুষের স্বপ্ন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু একটা বিশ্ব, একটা পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সবার ভালোবাসা। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আজ আমরা যে বিশ্ব তৈরি করে যাচ্ছি, তা যেন পাঠ্যবইয়ে এমন কোনো বিলুপ্ত সময়ের প্রতিনিধিত্ব না করে, যা পড়ে তারা শঙ্কিত বোধ করবে, বরং সে বিশ্ব হোক ভালোবাসার আর উদারতার। জেগে উঠুক মানুষের মধ্যেকার মনুষ্যত্ব আর মানবিকতাবোধ।
n লেখক :শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
