একগুচ্ছ কবিতা

আপডেট : ০৯ জুন ২০২০, ১৫:০৯

জীবনপুর

বুবুর মুখটি এখন দূর-গাঁয়ের সন্ধ্যা-পিদিম- 
কখনো স্মৃতি কখনো বিস্মৃতি-
চালশে কালশে চোখে আলাজিলা আলাজিলা দেখি!
মনে পড়ে-
এমনি নিদারুণ চৈতা দুপুর ছিলো একদিন,
ওলাওঠা গুটি বসন্তে এমনি ছিলো মহামারি দিন,
ছিলো দুর্ভিক্ষের মহা দুর্দিন!

 

মা- আমাদের মা- 

আমার ও আমার ছোট বোন আয়েশার
উপোস দেখতে দেখতে যখন দিশেহারা! তখন-
একদিন খুব ভোরে পাঠিয়ে দিলেন বুবুদের বাড়ি-
খরা আর মরার পোড়ার রোদে সারাদিন হাঁটতে হাঁটতে করিব ওয়াক্তে সেবার পৌঁছেছিলাম জীবন নিয়ে জীবনপুর। 
মেঠোপথ আলপথ জঙলাপথে আমরা ভাই আর বোন
রাস্তায় গাছতলা জিরিয়ে জুরিয়ে হাঁটি আর হাঁটি;
কল পেলে পানি খাই, পানি খাই। সেই অমৃত জীবনে ফের কোনোদিন আর খাওয়া হয়নি!
পানি কি ওঠে! নিদারুণ মাসে-
আমি কলে একবার বাদুড় ঝুলি- 
চুয়ে চুয়ে ঝরা পানি আজলা ধরে ধরে আয়েশা খায়।
আবার সে বাদুড় হলে আমি আজলা ধরি; 
পাতালের অমৃত টেনে টেনে তুলি!
চোখে ঘোর দেখতে দেখতে বোনের আঁচলে এসে দাঁড়াবার স্মৃতি আজও এইতো সেদিন সেদিন মনে হয়। 
আমাদের মুখ দেখে বুবুর সেকি মাতম, যেন দুঃখনদী তাঁর দু’চোখ ঝাঁপ দিয়ে দিয়ে পানি আর পানিতে ভাসে!

আমি টু'তে কাঁদি, আয়েশা তখনো স্কুলে পা রাখেনি।
শিকেয় তোলা ভাগ্নে মানিকের আন্ডা খাই আমি আর আয়েশা মনি, 
মানিক ভোরে চোখ কচলাতে কচলাতে আমগাছে ঘুঘুর বাসা দেখায়, গাবফুলের মালা গেঁথে দেয়,
বিকালে হাট চেনায়, 
নাড়ু কিনে দেয়, 
লজেন্স গুঁজে দেয়-
হাট থেকে ফিরতে ফিরতে বলে ‘বাবার থেকে পয়সা লয়ে কাল কৃষ্ণার দোকানে তোমায় রসগোল্লা খাওয়াবো নে মামা, তুমি যাবে না যাবে না, হে।’

খাইয়ে-পরিয়ে ওই দুর্ভিক্ষে আমাদের দেহ থেকে বের হওয়া ডালপালা ঢেকে দিয়েছিলো সে'বার জীবনপুর!

 

বহুদিন পার হলো!

বুবু-দুলাভাই আমাদের ছেড়ে গেছে সাত-সাতটি বছর।
আমি আমার সংসার নিয়ে ঘরভাড়া করি ঢাকায়-

একদিন সন্ধেবেলা ঘরে ঘণ্টা বাজে কর... কর...। 
খুলে দেখি দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মানিক আমার,
কতোদিন পর-
মানিক আমাদের! আমার ও আয়েশার!

দুর্ভিক্ষের কথা প্রাণে এসে ছুরিঘাই মারে!
ভাগিনার ঘুঘু দেখানোর কথা মনে পড়ে,
লজেন্স, নাড়ু, রসগোল্লার কথা মনে পড়ে...
আহারে কতোদিন যাই না বুবুদের বাড়ি।
বিয়ের পর আমি যেন সানিয়ার মার পোষা ময়না হয়ে গেছি।
কতোদিন দেখি না- 
পেকে গিয়েছে দাঁড়ি, কুঁচকে কুঁচকে কী হাল চাঁদপানা মানিকের মুখখানি...
ডাক দিই ছেলেকে, ডাক দিই মেয়েকে-
ওরা এঘর ওঘরে- কেউ মোবাইলে, কেউ টিভিতে বসে বসে
এ ও করে। আমি বলি আসো, ওরা বলে আসি আসি...


আসে না! আসে না!!

আমার অবারোমাস ঘরপোষা মরদ চেপে চেপে 
মুখ দিয়ে লম্বা সরল হাসি হাসি ডাক দিই-
‘এসো এসো তাড়াতাড়ি,
এসো সানি’র মা, দেখো দেখো কে এসেছে কতোদিন পর!’
সানি’র মা আসে না... আহা আসে না মানিকের মামানি...
চুলোঘরে শুরু হলো পাতিলের ঝনঝন চামিচের বাড়াবাড়ি-
আমার বুকের ভেতর সে পদাবলি ঘণ্টা বাজায় ঠনঠন কনকনানি!
হঠাৎ কালবোশেখি! 
‘এতোদিনে এলো পরানের মানিক, তবুও এ কালবোশেখি ঘরে আমার কেন বলেন আল্লাহ মালিক!’
বুবুর আদুরে পুত, বড়ই সংবেদী-
চুলোঘরের ঘূর্ণিঝড়ে ভাগিনার মুখটি অকস্মাৎ চিমে গেল- লাথি খেয়ে হঠাৎ আকাশে ফুটে যাওয়া বলের মতো!
মানিক বসতে বসতেই বলে, ‘মামা দেরি করা যাবে না;
রাতের গাড়িটা ধরা গেলে বাঁচি!’
মানিক শুনেছে নিশ্চয় মামানির পাতিলের মারামারি, ইচ্ছের ঠুকাঠুকি-
‘বাড়িতে মেলা কাম পড়ে আছে মামা,
শোনো বৈশাখে তোমাদের নাতিনের শুভ বিয়ে-
যাবে কিন্তু সব তোমার বুবুর বাড়ি।’
সানি’র মা নিশ্চয়ই শুনেছেন, ভাগিনা আজই ফিরে যেতে চায় বাড়ি!
শুনে কীযে হুড়োহুড়ি তার মামানির, তিনি এসে গেছেন পড়িমরি! 
-‘ওমা কেবল তো এলেন,
আমরা কি পর লাগি?
এক কাপ চা না খেয়ে যাবেন? সে কী!
আপনার মামা খালি মানিক মানিক করে, ভাগিনার কথা সারাদিন মামার মুখে মুখে থাকে...’
মানিক দেরি না করে রাতের গাড়িটা ধরতেই বেরিয়ে গেছে-
এবার তিনি বলছেন মুখিয়ে মুখিয়ে-‘এতো হৈ হৈ করো তুমি,
বাড়িতে কি বাঘ না মহিষ পড়েছে?’
তাইতো বাঘও নয় মহিষও নয় আমার মা-মরা ভাগ্নেটা এখন
বিপন্ন ঘরের অতি সাধারণ গেরস্থ বেচারা প্রাণী!
আহা মানিক তোমার কাপুরুষ মামা ইজ্জত ইজ্জত করে মানিয়ে নিতে নিতে নির্বিকার পাথর হয়েছে কবে! 
তুমি জেনে যাও-
‘তোমার হাটের নাড়ু,
তোমার মায়ের আঁচল,
তোমার লজেন্স-
দুই কুড়ি বছরে ঢাকায় আসতে আসতে, চুষতে চুষতে সব ফুরিয়ে ফেলেছি বহুদিন আগে!’
আমার ঘরপোষা রাগ নামাতে নদীর ভাটাজলের মতো সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে চুপি চুপি নিচে নেমে আসি ফুটপাথে।
একটা লাল সিগ্রেট ধরাই, তামাক পুড়তে পুড়তে ধুয়োর সাথে সাথে মাথা থেকে মিলিয়ে যায় জীবনপুর। 
কবে থেকেই আমি বেশ সংসারী, মানিয়ে চলা শিখেছি!

 

সঙ্গরোধে

লিলুয়া বাতাস বহে। আজ। খুব না?
বকুলের মোড়টায় মনটা মোচড়ায়?
কে জানি আসে, কে জানি যায়! একলায়!
একলায় সব দুখ আজ সে ফুরায়? 
আজ মনতলা মেলা, আহা! ছিলো না?
গেলে নস্টালজিয়া হতো বঁধু, খুব না?
আজ তোর বাড়ি সব ইচ্ছে! আজ না?
এমনি বোশেখ একদিন, ঠিক না? 
তোর আঁচল আমার পিঠে কী ইচ্ছেয়
ছুঁয়েছিলো খুব না? প্রেম না! আজ না! 

 

লোকান্তরে 

লোকান্তরে একদিন আমি কি আমারই হবো?

স্পর্শে গন্ধে অনুভবে আমাকেই বুঝে নেবো আমি?
এই মাটি এই ঘর এইসব পড়শি বুঝে নেবো আমি?
এই নদী এই গাছ এই লতাপাতা বুঝে নেবো আমি?
এই গ্রাম এই নগর বন্ধু ও স্বজন বুঝে নেবো আমি?
পূর্ব উত্তর দক্ষিণ ও পশ্চিমের হাট নদী মাঠ বুঝে নেবো আমি?
বিয়োগান্তে বিলীন তুমি, তোমাকেও বুঝে নেবো আমি?
আমবনে পাগল দুপুর গন্ধমুগ্ধবোল বুঝে নেবো আমি?
ঝুল খাওয়া চান্নির হাওয়া মাধবীটা বুঝে নেবো আমি?
এই গেরস্থ বসতের শস্যতোলা দিন বুঝে নেবো আমি?
শালিক টুনি বুলবুলি ঘুঘু, এ বাড়ির বাবুই বুঝে নেবো আমি?
এই বর্ষানদীর ঘাট, গ্রীষ্মবেলার বটছায় বুঝে নেবো আমি?
শরতের গৃহপালা উদাসিনী মেঘ বুঝে নেবো আমি?
হেমন্তের হলুদ মোলায়েম সুখছাওয়া মাঠ বুঝে নেবো আমি?
মেঠো এক বাড়িফেরা মুখর সন্ধ্যাপথ বুঝে নেবো আমি?
বিষণ্ন গোধূলিতে হাটভাঙা বিচিত্র মানুষ বুঝে নেবো আমি?
বিহান ও সন্ধ্যাপাখিতে বাজার হওয়া বন বুঝে নেবো আমি?
আষাঢ়ের আড্ডালাগা কারো বাংলায় অফুরান বেলা বুঝে নেবো আমি?
পউষ সংক্রান্তি মেলার বাঁশপালায় জমান মুদ্রা বুঝে নেবো আমি?
ঈদ ঈদ লাগলো বলে ভালোলাগা অঘুমা নিশি বুঝে নেবো আমি?
মাঠের ওপার থাকা বুবুর বাড়ি- বাবার হাত ধরে, মায়ের আঁচল টেনে টেনে যাবো আমি?
লোকান্তরে আমারই প্রেম বুঝে নেবো আমি?


লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

ইত্তেফাক/আরএ