সারা পৃথিবীতে নাক-মুখ ঢাকার এক চিলতে কাপড় ওরফে ফেইস মাস্ক বা ‘মুখোশের’ যা চাহিদা, তার অর্ধেক তৈরি হয় চীনে। সেই চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে যখন করোনা ভাইরাস (‘কোভিড-১৯’ নামকরণ হয় পরে) মহারাগে ফেটে পড়ল, পরিস্থিতির সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতালগুলো দেখে যে ‘রোগ আছে তো মাস্ক নেই’, অবস্থা তো সাংঘাতিক, ভয়াবহ। ৩ হাজারেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী সেবাযত্ন করতে গিয়ে রোগী হয়েছেন। “‘করোনা’ কী করবে”—এর পূর্বাভাষ পাওয়ামাত্রই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং বাংলাদেশও বাদ পড়েনি—দমাদম স্পেশাল প্লেন বোঝাই করে যার যার নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে লাগল।
জানুয়ারি ২০২০ সাল তখন। চীনের চাওয়া অন্য রকম। তার দরকার মাস্ক, মাস্ক এবং মাস্ক। জাপান, ভারত, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, তানজানিয়া, কেনিয়া—সবার কাছ থেকে মাস্ক আমদানির চেষ্টা করে চীন। শেষোক্ত দুই দেশে দালালেরা মাস্ক কিনে কিনে চীনে পাঠায়। (যুক্তরাষ্ট্র কিউ-ই তথা কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের জন্য ডলার ছাপানো ছাড়া তো নিজের দেশে প্রায় কিছুই উত্পাদন করে না!)। অবস্থা যে সুবিধের নয় বুঝতে পেরে জাপান, ভারত, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্র ইত্যাদি মাস্ক তৈরিকারী দেশগুলো জানুয়ারি মাস থেকে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। দেবেই তো! কথায় বলে, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’! অবশ্য চীনের এই দুর্যোগ দেখে ভারত অস্থায়ীভাবে রপ্তানি আইন শিথিল করে, রাশিয়া সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে, এমনকি দুই দেশের মধ্যে কয়েক প্রজন্ম ধরে বিদ্যমান শত্রুভাবাপন্নতাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় জাপান, ১ মিলিয়ন মাস্ক এবং বিবিধ রকমের স্বাস্থ্য-সরবরাহ পাঠায় চীনে, বাক্সের ওপরে বাণী—‘দেশ দুটো বটে, কিন্তু আকাশ তো একটিই’। টোকিওর সুবিখ্যাত ‘মাতসুইয়ামা ব্যালে কোম্পনি’র শিল্পীরা স্টেজে দাঁড়িয়ে অডিয়েন্সের সামনে চীনের জাতীয় সংগীত গাইলেন। অভূতপূর্ব মুহূর্ত একটি! প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মাস্ক কূটনীতি/মাস্ক ডিপ্লোমেসি’র সুন্দর একটি দৃষ্টান্ত। ভ্যাটিকানের পন্টিফ ফ্র্যান্সিস কনফুসিয়াসের দেশ চীনে ৬ লাখ মাস্ক পাঠিয়ে দেন। এক ভক্ত (উত্তর তাইওয়ানে) কনফুসিয়াসের প্রতিমূর্তিকে মাস্ক পরিয়ে দেন। কিছুদিনের ব্যবধানে সংকট থেকে বেরিয়ে আসা চীন ভ্যাটিকানের মহানুভবতার প্রতীকীস্বরূপ ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি দেশে মাস্ক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসামগ্রী প্রেরণ করে। ১০ মার্চ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সরেজমিনে উহান শহর দেখার পরে ঘোষণা করেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ এটি একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা, এই ঘোষণার মাধ্যমে কোভিড-১৯-কে নিয়ন্ত্রণে আনার ‘আর্ট’ রপ্তের কথা বলা হয়। ইত্যবসরে ইতালিতে ‘দ্বিতীয় উহানের’ সূচনা হয়ে গেছে। ইতালির এই দুর্দিনে ইইউর কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলে না বটে, তবে ইতালির সমস্যার সমাধান হয় ঠিকই। ‘লোম্বার্ডি’ অঞ্চলে ‘এয়ার ব্রিজ’ স্থাপন করে চীন ডাক্তার, ভাইরাস রোগ বিশেষজ্ঞ, প্লেনকে প্লেনভর্তি মাস্ক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সামগ্রী পাঠিয়ে দেয়। চীনের এই কর্মকাণ্ডে ভেনেজুয়েলা ও কিউবার ডাক্তারের দলও অংশ নেয় এবং বলাই বাহুল্য যে কিউবার ধন্বন্তরি ‘ইন্টারফেরন-আলফা২বি’ ওষুধও থাকে। পঞ্চাশের দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সব রকমের নিষেধাজ্ঞা জারি করে করে দেশটিকে অবরুদ্ধ অবস্থায় রেখেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার জট অবশেষে এমন জং ধরা অবস্থায় চলে আসে যে হোয়াইট হাউজ পরিত্যাগের মাস কয়েক পূর্বে প্রেসিডেন্ট ওবামা জটের যত্সামান্য আলগা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, অর্থাত্ কিউবার বিরুদ্ধে আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞা-ভাইরাস সত্ত্বেও কিউবার মতো এত ডাক্তার পৃথিবীর আর কোনো দেশ তৈরি করে কি? না, করে না। পৃথিবীর যেখানেই মানুষের জীবন হুমকির সম্মুখীন, সবার আগে কিউবার মেডিক্যাল টিম সেখানে গিয়ে হাজির হবেই হবে, সঙ্গে অনিবার্যভাবেই ৪০ বছর পূর্বে তাদের আবিষ্কৃত ‘ইন্টারফেরন-আলফা২বি’। কিউবার বায়োকিউবাফার্মার তৈরি এই ওষুধ ‘সার্স’, ‘মার্স’ ও ‘ইবোলা’ চিকিত্সায় সফল হয়েছে। রিকম্বিন্যান্ট ইন্টারফেরন-আলফা২বি এবং আরো কিছু ওষুধ (২২টি) চীনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে কোভিড-১৯ ভাইরাস চিকিত্সায় সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার হয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট চিকিত্সার জন্য ইন্টারফেরন-আলফা২বি-কে মজুতে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তাছাড়া চীনের জিলিন শহরে অবস্থিত ‘চাংচুন হেবের বায়োলজিক্যাল টেকনোলজি’ যৌথ উদ্যোগে কিউবার বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে ইন্টারফেরন-আলফা২বি উত্পাদন করছে। ইতালি ছাড়াও চীনের প্রধান ইউরোপীয় গ্রহীতারা ছিল ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, চেক প্রজাতন্ত্র, পোল্যান্ড, সার্বিয়া ইত্যাদি। ইতালির মতো সার্বিয়াও বড়ো আশা করেছিল যে ইইউর কাছ থেকে নগদ মূল্যে মাস্ক কিনবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে।
অবশ্য সার্বিয়ানরা এমন অর্বাচীন হয় কী করে! যারা ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে একটানা ৭৮ দিন বোমাবর্ষণ করল, অসামরিকদের মারল, তাদের ওপর নির্ভর করা! সার্বিয়া দেখছে না যে দশকের পর দশক ধরে তুরস্ককে তারা মিথ্যা কথা বলে আসছে! শেষ পর্যন্ত সার্বিয়া প্রকাশ্যে চীনের দ্বারস্থ হয়, চীন প্লেনভর্তি মাস্ক, স্বাস্থ্যসামগ্রী ও ডাক্তারের দল পাঠিয়ে দেয়। পরে রাশিয়াও ১০টি হেভি ট্রান্সপোর্টে ভর্তি স্বাস্থ্যসামগ্রী ও বিশেষজ্ঞ দল পাঠায়। যা হোক, লোম্বার্ডির ব্যবস্থা হলো বটে, কিন্তু থেকে যায় উত্তর ইতালির ‘বেরগামো’। আক্ষরিক অর্থেই ইতালি তখন কোভিড-১৯-কে নিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থায় রয়েছে। ২৫ মার্চ রুশ সেনাবাহিনীর রেডিয়েশন, কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল ইউনিট ‘বেরগামো’র সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নেয়, রুশ অ্যারোস্পেস ফোর্সেস ‘এয়ার ব্রিজ’-এর মাধ্যমে ১৫টিরও অধিক ভারী ট্রান্সপোর্টারে হরেক রকমের মাস্কসহ সম্ভাব্য সব রকমের স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং লোকবল প্রেরণ করে। পোল্যান্ড তার আকাশপথে এই রুশ বিমানগুলোকে উড়তে দিতে অসম্মত হয় বলে ৩ হাজার কিলোমিটার আকাশপথ বাড়তি উড়ে বেরগামোতে ঠিকই পৌঁছায়। রোগ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত ‘বেরগামো’তে রুশ সেনাবাহিনীর ইউনিটটি অবস্থান করে। ‘ন্যাটো’র একটি দেশে কোভিড-১৯-এ আক্রান্তদের চিকিত্সাকর্মে রুশ সামরিক ইউনিট ব্যস্ত—ভাবা যায়? এই সুন্দর সত্যের চমত্কারিত্বে অভিভূত হলে, আন্দ্রেই মার্তিয়ানভের (Andrei Martyanov)-এর ব্লগটি পড়তে ভুলবেন না, ‘রাশান ইনভেশন অব ইতালি’ (Russion invasion of Italy) গুগল করলে পাবেন। অন্যদিকে ২৫ মার্চ ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ‘নারকো-সন্ত্রাসী’ ঘোষণাসহ ধরিয়ে দিতে পারলে ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার প্রদানের কথা বলে।
তাছাড়া, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তেলের দেশ ভেনেজুয়েলায় জ্বালানি তেলের হাহাকার সৃষ্টি হয়। ইরানের ওপরও আরো কী কী সব কড়াকড়ি আরোপিত হয়। কিন্তু এদেরও তো মাস্ক, টেস্টকিট, অন্যান্য স্বাস্থ্য সরবরাহের প্রয়োজন; কে পাঠাবে? আধুনিক ই-কমার্সের ‘মোগল’ আলিবাবা গ্রুপের মালিক জ্যাক মা সম্পূর্ণ দক্ষিণ আমেরিকার দায়িত্ব নিয়ে নেন। আর ইরান নিষেধাজ্ঞার পরোয়া না করে ‘ক্যারিইং কৌল টু নিউ ক্যাসল’ স্টাইলে কয়েক জাহাজভর্তি অপরিশোধিত তেল দিয়ে আসে ভেনেজুয়েলাকে। জ্যাক মা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রকেও ৫ লাখ টেস্ট কিট ও ১ মিলিয়ন মাস্ক উপহার দেন; তবে ‘কিউবাতে মাস্ক, টেস্ট কিট ইত্যাদি পাঠানো চলবে না’র ঘোষণা থেকে ওয়াশিংটনকে টলানো যায়নি। বরং কিউবার ওষুধপাতি ও ডাক্তারি সাহায্য গ্রহণের জন্য ইতালিকে মাইক পম্পেওর চোখ রাঙানি সামলাতে হয়েছে। মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস ইত্যাদি নিয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বিশ্বকে বেশ খেল দেখায়, যেমন চীনে অর্ডার দিয়ে কেনা সুইজারল্যান্ডের মুখোশের সাপ্লাই জার্মানি বাজেয়াপ্ত করল বা আগাম মূল্য দিয়ে কেনা ফ্রান্সের মাস্ক অর্ডারভর্তি প্লেনকে থামিয়ে (চীনের বিমানবন্দরে) দ্বিগুণ মূল্য দিয়ে সেই প্লেনকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী করা হলো কিংবা (চীন থেকে) জার্মানিমুখী মাস্ক বহনকারী বিমানকে থাইল্যান্ড বিমানবন্দর থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। অবস্থা বেগতিক দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘটা করে ঘোষণা করল যে মাস্ক পরার বিশেষ কোনো উপকারিতা নেই (সম্প্রতি অবশ্য হু সুর পালটে বলেছে যে বাইরে বের হলে মাস্ক পরা আবশ্যক)। তাতে কাজ হয় যে জার্মানি ও ফ্রান্স সম্মিলিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পাইরেসি’র জন্য গালমন্দ করা বন্ধ করে।
এবার ১৯৫৭ সালের উদাহরণ নিন! সে বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন এক ইনফ্লুয়েঞ্জা (H2N2) আবির্ভূত হলো। এখনকার তুলনায় পৃথিবীর জনসংখ্যা অনেক কম তখন। সেই পান্ডেমিকের এপিডেমিকে সারা পৃথিবীতে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মরে গেল, একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই মৃতের সংখ্যা ১ লাখের বেশি। সব সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ডিসিতে লিয়োনার্ড বার্নস্টাইন ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’র ট্রাইআউটস করলেন, সেপ্টেম্বর মাসে ব্রডওয়েতে মঞ্চায়ন হলো, ফোর্ড কোম্পানি গাড়ির নতুন মডেলের শো করল, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঠান্ডাযুদ্ধ পুরোদমে অব্যাহত রইল। মার্কিন মুদ্রায় ‘আমরা খোদায় বিশ্বাস করি/ইন গড উই ট্রাস্ট’ মুদ্রণ শুরু হলো। আর অবশ্যই এলভিস দ্য কিংয়ের ‘রক এন রোল’ বিশ্বকে দ্রুত নতুন ছন্দময়তার দিকে নিয়ে যেতে ব্যস্ত। বিশ্ব থমকে যায়নি কিন্তু!
n লেখক :বিজ্ঞান লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
