তারুণ্যের স্বপ্ন রক্ষা

আপডেট : ০৯ জুন ২০২০, ২১:১৮

২৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই চিন্তা করেছি শিক্ষার্থীদের মঙ্গলের কথা। তাদের মন ও মননের বিকাশে সর্বদা নিজের চিন্তা-চেতনাকে জাগ্রত রেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেমিস্টারে ফলাফল প্রস্তুতের সময় আমরা সবসময় খেয়াল রেখেছি কোনোভাবে যেন আমার উদাসীনতা শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ না করে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে বিষয়ভিত্তিক তত্ত্বীয় পরীক্ষার প্রথম পত্র, দ্বিতীয় পত্র ও উপস্থিতির নম্বরসহ মোট ৩০০ নম্বর হয়। ন্যূনতম পাশ নম্বর ১২০। কম্পিউটারে ডাটাএন্ট্রি করে যোগফল যদি ১১৯ হয় তাহলে ফলাফল তৈরির সফটওয়ারের যুক্তির বদৌলতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা ১২০ হয়ে যায়। আবার যদি কোনো ছাত্র কোনো বিষয়ে ৭৯ পায় তাহলে তাকে আমরা সাধারণত ৮০ করে দেই। এটাই আমাদের ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এবার এসএসসি. পরীক্ষায় খেয়াল করলাম বহু ছাত্র ৭৯ পেয়ে ‘এ’ পেয়েছে। শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি মেনে নিতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কারণ মানুষ তৈরির কারিগর শিক্ষকের হাতে বিষয়টি থাকলে তারা এমন প্রান্তিক নম্বরকে বাড়িয়ে ৮০ নম্বর করে দিতেন, তা শিক্ষক হিসেবে আমি ১০০ ভাগ হলফ করে বলতে পারি। সারা বিশ্বে শিক্ষকেরা ছাত্রদের আগ্রহ ও উদ্দীপনা বৃদ্ধিতে এভাবেই কাজ করেন।

আমি কিছু কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা দেখেছি যেখানে দুই জন পরীক্ষক পরীক্ষার খাতায় কোনো নম্বর না দিয়েই নম্বরপত্রে নম্বর তুলে খাতা দেখেন। তারপরে যদি দুই জনের পরীক্ষিত মোট নম্বরের পার্থক্য ষোল হয় সেক্ষেত্রে ঐ রোল নম্বরগুলোর খাতা তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়। তৃতীয় পরীক্ষকের খাতা দেখার বিষয়টিও প্রায়শ ঘটে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি ভেদে খাতা দেখার নম্বরের পার্থক্য হয়। যে বিষয়টি বললাম এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিষয়। এক্ষেত্রে খাতার সংখ্যা ১০০টির বেশি হয় না। মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিকে অল্প সময়ে অধিক খাতা দেখতে দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে, শিক্ষার্থীদের প্রতি নিজের অজান্তেই খাতা দেখায় বৈষম্যের সৃষ্টি হতে পারে। স্কুল কমিটির অভিভাবক প্রতিনিধি থাকায় দেখেছি শিক্ষক ভেদে কখনো কখনো সঠিক উত্তরে শূন্য দিয়েছে আবার ভুল উত্তরে নম্বর দিয়েছে। এক জন হেড এক্সামিনারের সঙ্গে কথা বলছিলাম এ নিয়ে। তিনি মজা করে বললেন, ‘আজকাল নম্বর দেওয়ার প্যাটার্ন ১,১,২,৩—এটাই ফলো করা হয়। কারণ এত খাতা ঠিকমতো পড়ে বেশির ভাগ শিক্ষকই সঠিক পরীক্ষণ করেন না’। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা শিক্ষক হিসেবে নিজেদেরই বদনাম করা হয় কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটাই রূঢ় বাস্তবতা। তাই বলা যায়, পরীক্ষা দিয়ে কেউই বলতে পারবে না কী ঘটবে তার ভাগ্যে’। 

করোনার মতো মহামারি যখন আমাদের দেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, সংগত কারণেই সবাই বাসায় থাকতে থাকতে মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত। এমন অবস্থায় কোমলমতি ছাত্রদের ৭৯ নম্বর ৮০ না করে ৯ কমিয়ে ৭০ নম্বর করা শিক্ষার্থীদের জন্যে নতুন দুঃখের অবতারণা। মাধ্যমিকে প্রতিটি গ্রেডের পার্থক্য ১০ নম্বর। অর্থাত্ এক জন ছাত্রের ৭০ থেকে ৭৯ নম্বর পর্যন্ত ‘এ’ গ্রেড যার সাংখ্যিক মান ৪। আরো গভীরভাবে চিন্তা করলে ৭০ পাওয়া আর ৭৯ পাওয়া ছাত্রকে কি এক মাপকাঠিতে বিচার করা যায় ? তাই ৭৯-এর পরিবর্তে যখন আমি ৪ বা ‘এ’ গ্রেড দিচ্ছি প্রকৃতপক্ষে তার নম্বর ৯ কমে ৭০ হয়ে যাচ্ছে। এখন আমার প্রশ্ন গ্রেড রক্ষায় কারোর নম্বর ৯ কমানো উচিত না কি তাকে উত্সাহিত করার জন্যে তার গ্রেড এক বাড়িয়ে ‘এ+’ এ উন্নীত করা উচিত। এক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডের রেজাল্ট প্রসেসিংয়ের যে সফটওয়্যার আছে তাকে সামান্য পরিবর্তন করলেই বহু নির্বাচনি প্রশ্নের নম্বর ও লিখিত প্রশ্নের নম্বর যখন যোগ করে ৭৯ হবে তার স্থলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক বেড়ে ৮০ নম্বর হয়ে যাবে। এতে শিক্ষার্থীর উদ্দীপনা ও উত্সাহ বাড়বে।

কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে প্রযুক্তিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করব। প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রক নয়। শিক্ষার্থীদের পরিণতির জন্যে কম্পিউটারের মতো আবেগ, অনুভূতি বা হূদয়হীন একটি যন্ত্রের ওপরে দোষ চাপিয়ে আমরা বিবেকবান মানুষ কি দায়মুক্ত হতে পরি ? এটা কর্তৃপক্ষের কাছে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা। করোনায় প্রত্যেকটি জীবন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উত্সব আমরা পালন করতে পারছি না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু-কিশোরদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। এ কারণেই  জাতিসংঘ কর্তৃক শিশুদিবস ২০ নভেম্বর পালন করা হলেও আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন তথা ১৭ মার্চে পালন করা হয়। তার জন্মশতবত্সরে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে প্রান্তিক ৭৯ নম্বরকে ৮০ নম্বরে পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন রক্ষার একটি যৌক্তিক উদ্যোগ মুজিব জন্মশতবর্ষের উপহার হিসেবে তারুণ্যের স্বপ্ন বুননে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর