করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এবার কার্যকর লকডাউন শুরু হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতি পাওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউন শুরু হয়েছে। তবে ঐ এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি আর শঙ্কা রয়েছে। বিপদে পড়লে কি করবেন? তা নিয়েও দুঃচিন্তায় অনেকে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেও রয়েছে চরম উত্কণ্ঠা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ইরান ইত্তেফাককে বলেন, ‘মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে সোমবার দুপুরে আমাদের বৈঠক হয়েছে। সেখানেই বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। এখানে ১৬ হাজার ভোটার আছে। তবে মোট জনসংখ্যা ৫০ হাজারের মতো। এখানে কোনো অফিস নেই। পুরোটাই আবাসিক। পুরো প্রস্তুতি নিয়েই আমরা কাজ শুরু করেছি। যাদের ঘরে খাবার নেই তাদের খাবারও পৌঁছে দেওয়া হবে। আর যারা টাকা দেবেন তাদের বাজার করে পৌঁছে দেওয়া হবে। এমনকি চিকিত্সার জন্য সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। আর কেউ মারা গেলে দাফনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।’
পূর্ব রাজাবাজার এলাকা রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগর থানার মধ্যে পড়েছে। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানে আলম মুন্সী ইত্তেফাককে বলেন, ‘সোমবার বিকাল থেকেই ঐ এলাকায় মাইকিং করে বলা হচ্ছে, জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেন তারা কিনে রাখেন। এখন আগামী ১৪ দিন কাউকে ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে আমরা বাজার করে পৌঁছে দেব। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এই লকডাউন।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমান উপদেষ্টা ডা. মুস্তাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা তো শুরু থেকেই এভাবে কাজ করতে বলছি। এটাই মহামারি নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি। ঢাকার টোলারবাগ বা মাদারীপুরের শিবচরে এটা করে ভালো ফল মিলেছে। এখন এটা না করতে পারলে কিন্তু একসময় পুরো দেশটাই রেড জোন ঘোষণা করা লাগতে পারে।’
ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইরান বলেন, পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দাদের জন্য নমুনা সংগ্রহের বুথও করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের একটি প্যানেল তৈরি করা হয়েছে। এ-টু-আইয়ের সহযোগিতায় ২৪ ঘণ্টা টেলিফোনে চিকিত্সা সহায়তা পাওয়া যাবে। ঐ এলাকার বাসিন্দারা চাইলেই যে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাবেন।
তবে এই লকডাউনে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় থাকা পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গুলশানে একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করি। আমার বাসা এখানে। লকডাউনের কারণে আমি অফিসে যেতে পারব না। এভাবে অফিস মিস হলে আমাকে কি কোম্পানি রাখবে? বেতন দেবে? আমি লকডাউনে, কিন্তু আমার কর্মস্থল খোলা এটা কীভাবে হয়? এটার তো সমাধান হওয়া উচিত। এ নিয়ে এখন চিন্তায় আছি।’
পূর্ব রাজাবাজারের আরেক বাসিন্দা স্থানীয় মুদি দোকানি আলমাস বাসার বলেন, ‘মাসে ১৬ হাজার টাকা করে দোকান ভাড়া দিয়ে থাকি। ২ লাখ টাকা অ্যাডভান্স রয়েছে। এখন দোকান বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু ভাড়া তো বন্ধ থাকবে না। বাসা ভাড়াও দিতে হবে। আমার যদি আয় না থাকে তাহলে দোকান এবং বাসা ভাড়া কীভাবে দেব?’ আমিনুল ইসলাম বলছিলেন, ‘যারা সরকারি চাকরি করে তাদের তো সমস্যা নেই। কিন্তু যারা বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন, তাদের কি চাকরি থাকবে? কারণ প্রতিষ্ঠান তাকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন-ভাতা দিতে চাইবে না। আর যারা দিন এনে দিন খায় তাদের অবস্থা কী হবে? কয়দিন ত্রাণ দেবে এরা?’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পূর্ব রাজাবাজার এলাকার নাজনিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, এটুআই, ই-কমার্স অব বাংলাদেশ (ইক্যাব) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিকে নিয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। এলাকায় একটিমাত্র প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ (গ্রিন রোডে অবস্থিত আইবিএ হোস্টেলের পাশের সড়ক) খোলা থাকবে।
সেনাবাহিনীর টহল বৃদ্ধি
আইএসপিআর জানায়, এই লকডাউন প্রকল্প নিশ্চিতকল্পে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সেনা সদস্যরাও উক্ত এলাকায় মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে। এজন্য উক্ত এলাকায় সেনাবাহিনীর টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেনা সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে লকডাউন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ সমূহ গ্রহণ করবে।
