‘মানির অপমান বজ্রঘাত তুল্য’

আপডেট : ১০ জুন ২০২০, ২১:৪৩

আবদুল মান্নান

বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ মহামারি নিয়ে যত লেখালেখি ও বলাবলি হচ্ছে অচিরেই ‘মহামারি সাহিত্য’ বলে এক নতুন সাহিত্যের আত্মপ্রকাশ করবে বলে বিশ্বাস। আজ আমি করোনা নিয়ে নয়, লিখছি বাংলার বিবেক হিসেবে পরিচিত প্রয়াত সাহিত্যিক, এক সময়ের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবুল ফজলকে নিয়ে সাবেক এক আমলার একটা বানোয়াট লেখার প্রত্যুত্তরে। লেখাটি ছাপা হয়েছিল দেশের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকায় গত ৬ জুন ‘একজন উপাচার্যের জানাজা’ শিরোনামে। সাধারণত আমি কারো লেখা নিয়ে কিছু বলি না; কিন্তু বিষয়টা যখন একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে নিয়ে হয় তার প্রতিবাদ না করা অন্যায়। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য, দেশের প্রথিতযশা চিন্তাবিদ এবং জীবদ্দশায় বাংলাদেশের বিবেক অভিধায় ভূষিত আবুল ফজল এদেশের অধিকাংশ দেশপ্রেমিক সচেতন শিক্ষিত জনের শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জাতীয় পদক স্বাধীনতা পদকসহ অনেক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এই শ্রদ্ধা তিনি একজন বিবেকী লেখক, জাতির পথপ্রদর্শক এবং অগ্রণী চিন্তানায়ক হিসেবেই নিজগুণে অর্জন করেছিলেন। এমন একজন মনীষী সম্পর্কে সাবেক এই আমলার ভ্রান্ত ধারণা ও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে রচিত কটাক্ষপূর্ণ লেখাটি দেশের একজন শীর্ষ আমলার অজ্ঞানতা ও অসূয়াপ্রবণ মনের পরিচয় দেয়। এটি সত্যিই দুঃখজনক।

এই মহাজ্ঞানী আমলা সামাজিক মাধ্যমে, তার ভাষায় একজন ‘স্বনামধন্য অধ্যাপকের’ একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে কওমি মাদ্রাসার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে ‘আমাদের কিছু সুশীল সমাজের বা বুদ্ধিজীবীর’ মাদ্রাসা শিক্ষাবিরোধী মনোভাবের কথা তুলে ধরেছেন। সে প্রসঙ্গে তিনি প্রয়াত আবুল ফজলকেও এই কাতারে টেনেছেন কটাক্ষের পাত্র হিসেবে। বলা বাহুল্য, মাদ্রাসার শিক্ষা সম্পর্কে ‘সুশীল সমাজের’ সব বুদ্ধিজীবীর মতো এরকম নয়। বৃহত্তর স্বার্থে তার ভ্রান্ত ধারণা ও ভুল তথ্য সংশোধন করে দেওয়া দরকার। তিনি ধারণা করেছেন অন্য অনেকের মতো আবুল ফজলও ঢালাওভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। তবে তার এই ধারণার উত্স কী তা তিনি স্পষ্ট করেন নি। বলা দরকার, সেকালের অনেক বুদ্ধিজীবীর মতোই (যেমন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ) আবুল ফজলের শিক্ষা জীবনও মক্তব-মাদ্রাসাতেই শুরু হয়। এখানে প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত তা সম্পন্ন করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সেকারণে নয়, তার দূরদর্শী বিচক্ষণতার কারণেই এই বিষয়ে আবুল ফজলের নিজস্ব মতামত ছিল ব্যতিক্রমী, বিশিষ্ট। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর আমলে গঠিত কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট প্রণয়নের সময় এর সদস্যরা দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতামত গ্রহণ করেন। আবুল ফজল তাদের মাদ্রাসার শিক্ষা সংস্কার করে তা রাখার পক্ষে মত দেন। যা এর অনেক সদস্যকে কিছুটা হতাশও করেছিল এবং তাদের কেউ কেউ সেটা প্রকাশও করেছেন। এ সম্পর্কে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে আবুল ফজল একটি নিবন্ধ লেখেন ‘মাদ্রাসা শিক্ষার প্রয়োজন কী ফুরিয়ে গেছে?’ এ বিষয়ে তার মতামত বোঝার জন্য এটি তত্কালীন পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই লেখা থেকে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি ছত্র তুলে দিচ্ছি—

১. ‘মাদ্রাসা শিক্ষা আর আলেম সমাজ প্রায় অঙ্গাঙ্গি ভাবে সম্পর্কিত। এই দুইকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। তার ফলে বোধ করি কিছুসংখ্যক আলেমের দেশ আর মানবতাবিরোধী (একাত্তরের প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য) দুষ্কর্মের জন্য কেউ কেউ গোটা মাদ্রাসার শিক্ষাকেই তুলে দেওয়ার প্রস্তাব তুলেছেন। আমার মনে হয় এ ব্যাপারে যথেষ্ট বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। তড়িঘড়ি কিছু করা সঙ্গত হবে না।

২.             ‘জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বহু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়েই আমাদের জীবন কাটে। ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গৃহীত হলেও এসবের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে বা এ মুহূর্তে ফুরিয়ে যাবে বলে আমার মনে হয় না। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থও বোধ করি এই নয়।’

৩.             ‘অতি সাধারণ বিয়েশাদি জায়েজ করতেও মোল্লা-মৌলবিদের মন্ত্র আওড়াতে হয়।’ (মাদ্রাসা শিক্ষার প্রয়োজন কি ফুরিয়ে গেছে? শুভবুদ্ধি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭৯, মুক্তধারা, পৃষ্ঠা ৫২-৫৬)। এখানে বলা প্রয়োজন, প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা পাঠ করলে সবাই জানবেন তিনি মাদ্রাসার শিক্ষা সংস্কারের পক্ষে ছিলেন; কিন্তু তুলে দেওয়ার পক্ষে নয়।

প্রসঙ্গত বলা যায়, আবুল ফজল রচিত কোরআনের বাণী, হাদিসের বাণী গ্রন্থ দুইটি এক সময় বহুল পঠিত হতো। এছাড়া ইসলামি একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল তার রচিত জীবনীগ্রন্থ হযরত আলী (রা.)।

কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সামনে দেশের অনেক খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ পরামর্শ দিয়েছিলেন দেশে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকা উচিত। এটা কমিশনের সদস্য সদ্য প্রয়াত প্রফেসর আনিসুজ্জামান তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বিপুলা পৃথিবীতে’ উল্লেখ করেছেন (পৃষ্ঠা-৩৮)। ব্যতিক্রম ছিলেন আবুল ফজল।  প্রয়াত আবুল ফজল সাহেবের পিতা মৌলবি ফজলুর রহমান চট্টগ্রাম শাহে জামে মসজিদের ইমাম ছাড়াও বড়ো মাপের ইসলামিক পণ্ডিত ছিলেন।

সাবেক সচিব মহোদয় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আর একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি লিখেছেন ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের একটি অনুষ্ঠানে তত্কালীন উপাচার্য আবুল ফজল ছিলেন প্রধান অতিথি ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ মসজিদের তত্কালীন ইমাম সাহেব ছিলেন মূল বক্তা। একথা ঠিক ঐ ইমাম সাহেব একজন সুশিক্ষিত আলেম ও সুবক্তা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন; কিন্তু আবুল ফজলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অতি উত্সাহী সাবেক সচিব মহোদয় এই রকম একজন মানুষকেও মিথ্যা তথ্যের শরিক করতে দ্বিধাবোধ করেন নি। তিনি লিখেছেন যে, বক্তৃতার এক পর্যায়ে ইমাম সাহেব আবুল ফজলকে লক্ষ্য করে বলেছেন যে, আপনারা তো মাদ্রাসা ও মওলানাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন; কিন্তু দেখেছিলেন তো সেদিন আবুল হাশিম (প্রাক্তন মুসলিম লীগ নেতা) সাহেবের জানাজা পড়ানোর লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। তার লেখা পড়ে মনে হয়, আবুল ফজল সে জানাজায়ও উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু তখন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং চট্টগ্রামেই ছিলেন। অন্যদিকে জীবনের কোনো পর্যায়ে আবুল হাশিমের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ বা সম্পর্ক ছিল না। তদুপরি ইমাম সাহেব কীভাবে ১৯৭৩ সালে আবুল হাশিমের জানাজার কথা বললেন? কেননা তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন আরো এক-দেড় বছর পরে—৫ অক্টোবর ১৯৭৪। আর মুসলিম লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত, ইসলামিক একাডেমির প্রথম পরিচালক, (১৯৬০) The Creed of Islam এর মতো গ্রন্থের প্রণেতা, একজন প্রথিতযশা ইসলামিক চিন্তাবিদ ও তত্ত্বের লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির জানাজায় ইমামতির সংকট হবে সেটা বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা নয়। আর যে কোনো জানাজায় কমপক্ষে ১০/১২ জন মানুষ পাওয়া যাবে যারা জানাজার (এটি একটি দোয়া) ইমামতি করার যোগ্যতা রাখেন। এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বক্তব্য হলো—আমাদের দেশের দস্তুর অনুযায়ী এবং উক্ত ইমামের প্রজ্ঞাপূর্ণ রুচির কারণে তার পক্ষে খোদ উপাচার্যকে সামনা-সামনি কটাক্ষ করে কথা বলা স্বাভাবিক নয়। আবার স্পষ্টভাষী সত্যসন্ধানী আবুল ফজলও এধরনের যে কোনো ভ্রান্তি তাত্ক্ষণিক সংশোধন করে দেওয়ার কথা। অবশ্য নিন্দার জন্য নিন্দা করতে বসলে সত্যমিথ্যা, উচিত-অনুচিতবোধ লোপ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। আমাদের ছোটোকালের রামসুন্দর বসাকের বাল্যশিক্ষায় বলা আছে ‘মূর্খের সঙ্গে তর্ক করিও না’।

এই ঘটনার ১০ বছর পরে (১৯৮৩) আবুল ফজলের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি তার জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে একইভাবে ইমামসংকটের কারণে বিলম্ব ঘটতে দেখেছেন। এই লেখকের সেদিনের জানাজায় উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। জানাজা বিলম্বিত হওয়ার দুইটি কারণ ছিল। প্রথমত, প্রথমে আউটার স্টেডিয়ামের কাজীর দেউড়ি মসজিদের গলি বরারব অংশে জানাজা আয়োজনের চেষ্টা হয়; কিন্তু জনসমাগম বেশি হওয়ায় পরে স্থান পরিবর্তন করে পাশে সার্কিট হাউজ মাঠে (বর্তমানে শিশুপার্ক) জানাজা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। দ্বিতীয়ত চট্টগ্রামের তত্কালীন জিওসি জেনারেল মান্নাফ খবর পাঠিয়েছিলেন—তিনি জানাজায় শরিক হবেন। তার অংশগ্রহণের জন্যও একটু অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

এখানে এটুকু বলা দরকার, আবুল ফজল ছিলেন আমাদের কাজীর দেওড়ির কাজীবাড়ির জামাই। তার সেই স্ত্রী বেশিদিন না বাঁচলেও কাজীবাড়ির সবাই তাকে আজীবন পরিবারের একজন মুরুব্বি হিসেবে গণ্য করে এসেছেন। তাদের তত্ত্বাবধানে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

আশা করি, যিনি এক সময় দেশের শীর্ষ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি অবসর জীবনে যাই করুন না কেন দেশের কোনো বরেণ্য ব্যক্তির ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপনের চেষ্টা থেকে ভবিষ্যতে বিরত থাকবেন। আমার কর্মজীবনে বহু আমলার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে এবং তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন। দুই ধরনের আমলা দেখেছি। এক ধরনের হচ্ছে বিনয়ী, সত্ এবং মানুষকে সম্মান করতে জানেন। আর দ্বিতীয় ধরনের হচ্ছে চরম ইগো সমস্যায় ভোগেন আর নিজেদের সব জান্তা ‘শমসের মনে করেন। উল্লিখিত জন নিশ্চয় দ্বিতীয় শ্রেণির ভুক্ত। আবার রামসুন্দর বসাক। ‘মানির অপমান বজ্রাঘাত তুল্য’।

n লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন