প্রজ্ঞা আহম্মদ জ্যোতি
বহু বছর আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারের মতো ছিল মানুষের বাজার। হাঁকডাক করে বিক্রি হতো মানুষ। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কাছে পণ্য হিসেবে বিক্রি হয়ে দাসত্ব বরণ করত। হলিউডের একটি বিখ্যাত সিনেমা আছে—‘টুয়েলভ ইয়ার্স আ স্লেইভ’। সলোমন নর্থাম্প একজন কালো মানুষ। পরিবার নিয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করতেন আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। এক দিন দুই অচেনা ব্যক্তি তাকে ভালো বেতনে এক জায়গায় কাজের প্রস্তাব দেয়। তাদের ফাঁদে পা দেন সলোমন। তারা সলমনকে বিক্রি করে দেয় এক দাস ব্যবসায়ীর কাছে। তার স্বাধীন জীবনের অবসান ঘটে। এমনকি নিজের নামটাও সে হারিয়ে ফেলে। এই কাহিনী তখনকার সময় অবলম্বনে যখন দাসপ্রথা স্বীকৃত ছিল।
জাপানের সিনেমা সানসো দা বেইলিফসহ আরো অনেক সিনেমা তৈরি হয়েছে দাসপ্রথা ও মানব পাচার নিয়ে। আদিযুগ থেকেই এই প্রথার জন্ম। পুরুষদের বিক্রি করা হতো শ্রমিক হিসেবে নারীদের শ্রমিক, উপপত্নী এবং রক্ষিতা হিসেবেও বিক্রি করা হতো। আঠারো শতকের শেষের দিকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাসপ্রথার অবলুপ্তি ঘটে। ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে সরাসরি মানব বেচাকেনা। এখন প্রশ্ন হলো এই প্রথা কি বর্তমান যুগে পুরোপুরি বিলীন হয়েছে?
কয়েক মাস আগে মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক নির্যাতন এবং হত্যা নিয়ে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। নারীরা দেশীয় দালালদের প্ররোচনায় অধিক আয়ের আশায় এসব দেশে গিয়ে হয়ে গিয়েছিলেন দাসী হিসেবে বিক্রি। এখনো এমন অনেক নারী দাস হিসেবে জীবন-যাপন করছেন দেশগুলোতে।
এ সময়ের টাটকা দুঃসংবাদ হচ্ছে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যা। কাজের আশায় ইউরোপ যাবার উদ্দেশ্যে পাচারকারীর খপ্পরে পড়েছিল তারা। পাচারকারী থেকেই হাতবদল হয় তারা। সেই গ্রুপের একজন মানব পাচারকারীকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ২৬ জন বাংলাদেশিসহ ৩০ জনকে হত্যা করে পাচারকারীর স্বজনেরা। ঝামেলা পাচারকারী নিজেদের মধ্যে, কিন্তু মরতে হলো অসহায় মানুষগুলোর। এখন যেহেতু খোলামেলাভাবে মানব পাচার করা যায় না তাই বিভিন্ন প্রসেসে এই পাচারের কাজ করা হয়। এই বাংলাদেশিদের তাই প্রথমে লিবিয়া নিয়ে যাওয়া হয়। গত কয়েক মাস তাদেরকে লিবিয়ার ভেতরে গোপনে রাখা হয়েছিল।
২০১৪ সালে থাইল্যান্ডের রাবার বাগানে ১৩৪ জন মানুষের লাশ পাওয়া যায়। জানা যায় সেখানে বেশিরভাগ ছিল বাংলাদেশি। যাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল রাবার বাগানের শ্রমিক হিসেবে। অর্থাত্ এমন ঘটনার নজির অনেক। অনেক অসহায় মানুষ নিজে এবং পরিবারকে উন্নত জীবন দেওয়ার আশায় অন্য দেশে যেতে চায় কাজের সন্ধানে। আর তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় পাচারকারী চক্র। বিভিন্ন প্রভোলনে রাজি করে এই অসহায় মানুষদের। এরপর শুরু করে মানুষগুলোর জীবন নিয়ে খেলা। পণ্যের মতো হাতবদল হয় মানুষগুলো। আর পাচারকারী নিজেদের মধ্যে বনিবনা না হলে বলিও হতে হয় এই মানুষগুলোর। যার প্রমাণ কয়েকদিন আগের লিবিয়া হত্যাকাণ্ড। আপনার ধারণা কী এসবে শুধু জড়িত দেশীয় দালালচক্র। এই দালালরা শুধু ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। এর পেছনে রয়েছে আরো অনেক হাত। শক্তিশালী খুঁটি দিয়েই এসব পরিচালিত হয়। কোনো দেশের একার পক্ষে তাদের দমন করা সম্ভব নয়। এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ লাগবে। প্রয়োজন জোরালো ব্যবস্থার। ২০১৫ সালে লিবিয়াতে লোক পাঠানো বন্ধ করলেও কেন ২০২০ সালে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে! এটাই আমাদের বুঝিয়ে দিল কতটা কঠিন পদক্ষেপ প্রয়োজন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, অনার্স, চতুর্থ বর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
