মেডিক্যাল অক্সিজেনের নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন!

আপডেট : ১০ জুন ২০২০, ২২:৪৫

চট্টগ্রামে জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন নিয়ে ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে একটি অসাধু চক্র। করোনা পরিস্থিতিতে বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে যেনতেন প্রকারে মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে এরা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এই চক্রটি মেডিক্যাল অক্সিজেনের নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন বিক্রি করে জনস্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

জেলা প্রশাসনের কাছে এরই মধ্যে চট্টগ্রামের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে অভিযোগ এসেছে যারা এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে—সীমা এন্টারপ্রাইজ, মদিনা এন্টারপ্রাইজ, এয়ার গ্যাস, গোল্ডেন অক্সিজেন ইন্ডাস্ট্রিজ ও জিডি সুবেদার ইন্ডাস্ট্রিজ। এছাড়া আরো চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লিন্ডে বাংলাদেশ নামে একটি অক্সিজেন উত্পাদনকারী বৃহত্ প্রতিষ্ঠানের ডিলার     পরিচয় ব্যবহার করে মেডিক্যাল অক্সিজেন বিক্রির অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—হাসান ট্রেডার্স, ব্রাদার্স প্রকৌশলী ওয়ার্কস, বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, জিলানী অক্সিজেন লিমিটেড।

এদের মধ্যে বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজকে ২০১৬ সালে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। এছাড়া এদের ব্যবহূত সিলিন্ডারের মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার থেকে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা থাকে।  

জানা যায়, মেডিক্যাল গ্রেডের অক্সিজেন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেনের ঘনত্ব যথাক্রমে ৯৯.৯ শতাংশ ও ৬৫ শতাংশ। মেডিক্যাল গ্রেড চিকিত্সা কাজে এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহূত হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রয়োগকৃত অক্সিজেনের গুণগত বা পরিমাণগত হেরফের হলে রোগী নানা ধরনের জটিল সমস্যায় পড়তে পারেন। রোগীর ফুসফুসে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, তিনি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। তার মধ্যে অবসাদগ্রস্ততা বা ঝিমুনি ভাব তৈরি হতে পারে। তিনি অসংলগ্ন আচরণ করতে পারেন’।   

এদিকে অক্সিজেন নিয়ে অরাজকতা মোকাবিলায় অভিযান জোরদার করেছে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন। গতকাল বুধবার নগরীর সাগরিকা এলাকায় সরকারি ও বহুজাতিক মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত লিন্ডে বাংলাদেশের কারখানা পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম। এ সময় জানা যায়, ১ দশমিক ৪ কিউবিক লিটার মেডিক্যাল গ্রেড অক্সিজেন সিলিন্ডার (৯৯.৯% ঘনত্বের) এর রিফিলিং দাম ১২২ টাকা। কিন্তু আন্দরকিল্লা এবং সদরঘাট এলাকায় বিভিন্ন পাইকারি দোকানিরা এ পরিমাণ গ্যাস রিফিলিংয়ের ক্ষেত্রে দাম রাখছেন ১ হাজার টাকার বেশি। 

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, করোনাকালীন দুঃসময়ে কিছু প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের সিলিন্ডারে মেডিক্যাল গ্রেড অক্সিজেনের নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। এছাড়া আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লিন্ডে বাংলাদেশ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ডিলার পরিচয় ব্যবহার করে মেডিক্যাল অক্সিজেনের ব্যবসা করছে বলেও অভিযোগ পেয়েছি। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। 

লিন্ডে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামে সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব প্রতিষ্ঠানকে মাত্রাতিরিক্ত দামে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যক্তি পর্যায়ে বিক্রি এবং বেশি মূল্যে সিলিন্ডার গ্যাস রিফিলিংয়ের জন্য জরিমানা করা হয়েছে তারা লিন্ডে বাংলাদেশের বৈধ প্রতিনিধি নয়। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান তাদের প্যাডে লিন্ডে বাংলাদেশের নাম লিখে রেখেছে। লিন্ডে বাংলাদেশ শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রেসক্রিপশন এবং এনআইডি কার্ডের ভিত্তিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রি এবং রিফিলিং করে।

মেডিক্যাল গ্রেড অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহের ক্ষেত্রে লিন্ডে বাংলাদেশের কোনো ডিলার বা ডিস্ট্রিবিউটর বাংলাদেশে নেই। তারা হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ডিমান্ড/প্রেসক্রিপশনের ভিত্তিতে মেডিক্যাল গ্রেড সিলিন্ডারে অক্সিজেন সরবরাহ করে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, লাইসেন্সবিহীন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে নিজেদের ঘরে রাখা একটি বিপজ্জনক বিষয়। মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার থেকে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা থাকে।

আসছে ৪ হাজার মেডিক্যাল

গ্রেড অক্সিজেন সিলিন্ডার

অন্যদিকে, করোনা সংকট মোকাবিলায় আরো ৪ হাজার মেডিক্যাল গ্রেড অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রামের লিন্ডে বাংলাদেশ নামে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। এসব সিলিন্ডার আগামী ২০ জুন থেকে বাজারে আসার কথা রয়েছে। এতে করোনা রোগীদের চিকিত্সার পথ আরো সুগম হবে বলে লিন্ডে বাংলাদেশের বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তাদের কাছে পর্যাপ্ত মেডিক্যাল গ্রেড অক্সিজেন রয়েছে বলেও তারা জানান।