হাজার হাজার বছর আগে এই লোনা মরুভূমির পুরোটাই ছিল আরব সাগরের অন্তরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাগরের পথ ঘুরে যায়, আরো অনেক পরে প্রকৃতির ইচ্ছায় এ ভূমির নিচু স্থান উত্থিত হয় সমুদ্রের লবণের স্তরকে আগলে রেখে। সেই থেকে এ জনপদ লবণ ভূমি। কোনো গাছপালা নেই, নেই কোনো জনবসতি, চারদিকে অসীম সুন্দর লবণের দৃশ্যমান উপস্থিতি। মুঠো ভরে লবণ নিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া যায় লবণ সমুদ্রের দিগন্তে। লবণ মরূদ্যান নিয়ে দুই কিস্তি ভ্রমণকাহিনীর প্রথম পর্ব ছাপা হলো আজ
কিস্তি ১
ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। উত্তর ভারতে জাঁকিয়ে বসা শীত তখনো বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছে। আমি রওনা হয়েছি আহমেদাবাদ থেকে গুজরাটের ভূজ শহরের দিকে। দূরত্ব প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার। বাস, ট্রেন বা ট্যাক্সি ছাড়া আর কোনো যানবাহন নেই যে আমাকে দয়া করে পৌঁছে দেবে। বাসে নিজের সুবিধামতো পৌঁছানো যায়। আহমেদাবাদ থেকে বাস আছে প্রতি ঘণ্টায়। ট্রেন আছে দিনে দুটো। পথ সাঁ সাঁ করে চলে যাচ্ছে অনিমেষ শর্ষে খেতের পাড় ধরে, যেন কারো হলুদ শাড়িতে রঙের কাজ কোনোদিনও শেষ হবার নয়। মাথার ওপরে গাঢ় নীল আকাশ আর হলুদের পাশে চুপচাপ শুয়ে আছ সবুজ সবজি খেত, বাহারি কখনো এই রূপ, আবার কখনো একেবারেই শুকনো খটখটে লাল মাটির সমতল বা মাটির ঢিবি মাইলের পর মাইল। এর মধ্যে মাথা উঁচু করে কোনোরকমে জানান দিচ্ছে কয়েকটা কাঁটা ঝোপ বা বৃক্ষ, প্রায় মরুভূমি সদৃশ চরাচরে জানান দিতে চাইছে নিজেদের অস্তিত্ব। প্রাণের অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ একটু বেশি প্রকট, প্রাণ সবসময়ই চায় স্বীকৃতি। কোথাও উইন্ডমিলগুলো একা একা পাখা নাড়িয়ে নিজ মনেই কথা বলছে। এ রাজ্য বেশ সমৃদ্ধশালী ভারতে। লোকালয়ের আভাসও মিলছে মাঝে মাঝে। পুরোদস্তুর সাদা কুর্তা, ধুতি, সাদা পাগড়ি পরিহিত গুজরাটি পুরুষ বা রঙিন শাড়ি পরিহিত, নাকে বিশাল নথ, মাথায় এক হাত ঘোমটা, কানে ঝকমকে রুপোর বালি, হাতে মোটা চূড়া, পায়ে তারচেয়েও মোটা মল আর গলায় মঙ্গলসূত্রে গুজরাটের শাশ্বত নারী। কেউ বাজারে যাচ্ছেন, কেউ খেতে কাজ করছেন, কেউ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে, কেউ মাঠে গোল হয়ে বসে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। সবখানেই দুটি রঙ মিলেমিশে একাকার, সাদা আর লাল। মানুষও কি তাই নয়, নারীপুরুষ নির্বিশেষে মিলেমিশে একে অন্যের।

লবণ মরুভূমি
ভূজ শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা প্রায়। হোটেল অনলাইনে বুক করা ছিল। খুব ছোট শহর, বলতে গেলে মফস্বলই। হোটেল চেক ইন করে বেরিয়ে পড়লাম শহর জয় করতে। ঠান্ডাও বাড়ছে একটু একটু করে। মনে হলো রাতে খুব ৫/৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নেমে আসবে। ছোট ছোট দোকানপাট আর ছোট রেস্টুরেন্ট। ভূজ শহরে আসার মূল উদ্দেশ্য ‘সল্ট ডেসাট’ দেখা। সল্ট ডেসার্ট বা লবণ মরুভূমি, এমনও জায়গা আছে নাকি যেখানে মরুভূমির বালির বদলে শুধু মাইলের পর মাইল সাদা লবণ। কত বছর কেঁদেকেটে, ভূমিতে অশ্রুপাত করে লবণ জমিয়ে তবেই এই মরুর উৎপত্তি হয়েছে কে জানে।
ভূজ শহর থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে এই নোনা মরুর অবস্থান। প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সল্ট ডেসার্ট এই ‘রান অব কাছ্ব’, কাছ্ব বা কাচ্ব জেলায় অবস্থিত। বাকি অংশ যা পাকিস্তান সীমান্তের অপর পাশে তাও লোনা মরুভূমির সঙ্গে জুড়ে দিলে মোট এলাকা হবে ত্রিশ হাজার বর্গকিলোমিটার। ভাবা যায় এত বিশাল এলাকা জুড়ে মাটি বা বালির বদলে শুধু লবণ আর লবণ।
পরদিন খুব সকালে হাড় কাঁপানো শীতের ভেতর ট্যাক্সি করে চললাম লবণ মরুভূমি দেখতে। ট্যাক্সি চালকের নাম ইসমাইল। ত্রিশের কাছাকাছি বয়স, কথাবার্তায় অসাধারণ। আমাকে শুধু লবণ মরুই দেখাবে না, পাকিস্তান সীমান্তেও নাকি নিয়ে যাবে।
প্রথমে ঠিক হলো অল্প একটু সময় লবণ মরু দেখে তারপর যাব আরো সত্তর কিলোমিটার পশ্চিমে সোদরানা গ্রামে, ফেরার পথে সূর্যাস্ত দেখতে থামব লবণ মরুর বিশাল মৃত্তিকার বুকে।
পথের সৌন্দর্য আর বিশালতা অক্ষরে প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। দু’পাশে লাল মাটির সমতলভূমি, শুকনো খটখটে, মাঝে মাঝে বাবলা গাছের ঝোপ, আবার বিশাল শূন্য প্রান্তর। কিছু দূর অন্তর সবজি খেত।
পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় চেকপোস্টে নাম লিখিয়ে অনুমতিপত্র হাতে নিয়ে প্রবেশ করতে হয় সংরক্ষিত এলাকায়।
লাল মাটি আর বাবলা গাছের সারি ধরে কিছুদূর পার হওয়া, এর মধ্যেই প্রকৃতি সদয় হয়, পথের দু’ধারের মাটি লাল থেকে একটু একটু করে সাদা হতে চলেছে। মানে লবণ ভূমিতে এসে পৌঁছে গেছি। সবজি খেতের নিশানাও উধাও, গাছের দেখা মিলছে মাইলে একটা। আস্তে আস্তে পথ যেন একটা সাদা রাজ্যের মাঝখান চিরে উঠে এসেছে। এমন জায়গা দেখলে ভ্রম হয়, এত সাদা আগে দেখিনি। অদ্ভুত শান্ত বিরামহীন সমতল সফেদ মরূদ্যান। আশপাশে জনমানবের চিহ্ন নেই, কোনো শব্দ নেই। কী অদ্ভুত সাদা পরিদের রাজ্য! যেন পরিরা নিজেদের ডানা খুলে মাটিতে রেখে গিয়েছে মাটিকে আরো সুন্দর করে সাজাবে বলে। অপেক্ষায় রাখে আমার মতোন ভ্রমের পিয়াসীকে যারা ভাবে এই বুঝি এল পরি, ডানা পিঠে বেঁধে উড়ে যাবে। লবণ মরুভূমির সৌন্দর্য আর সাদা রঙের উৎস খোঁজার বিনিময়ে আমরা সহজেই মেনে নিতে পারি পরিদের আনাগোনার রহস্য।
হাজার হাজার বছর আগে এই লোনা মরুভূমির পুরোটাই ছিল আরব সাগরের অন্তরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাগরের পথ ঘুরে যায়, আরো অনেক পরে প্রকৃতির ইচ্ছায় এ ভূমির নিচু স্থান উত্থিত হয় সমুদ্রের লবণের স্তরকে আগলে রেখে। সেই থেকে এ জনপদ লবণ ভূমি। কোনো গাছপালা নেই, নেই কোনো জনবসতি, চারদিকে অসীম সুন্দর লবণের দৃশ্যমান উপস্থিতি। মুঠো ভরে লবণ নিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া যায় লবণ সমুদ্রের দিগন্তে।
খানিকটা সময় লবণ মরুতে কাটিয়ে ফের চললাম সোদরানা গ্রামের দিকে। পথে অপূর্ব এক জলাশয়ের দেখা পেলাম। চারদিকে সাদা লবণ মরুভূমির মাঝে পিচঢালা পথ আর মাথার ওপরে ঘন নীল আকাশ। এরই মাঝে ছোট্ট একটা জলাশয় এঁকেবেঁকে পথ করে নিয়েছে সাদা জমিতে।জলাশয়ের রং লাল। কী অদ্ভুত রঙের সমন্বয়! মনে হচ্ছিল যেন তুলিতে খুব যত্ন করে আঁকা, নীল, সাদা, লাল।
লাল রঙের জলাশয় এই প্রথম দেখলাম।গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম জলাশয়ের গা ঘেঁষে। জলের ধার দিয়ে যে মাটি বাঁধন তুলেছে সে মাটির রং সাদা। খানিকটা মাটি হাতে নিয়ে দেখলাম। খুব মসৃণ মাটি, বাবুই পাখির পালকের মতো। জলের রং লাল হলো কী করে! নিশ্চয়ই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু সবসময় বিজ্ঞান সাথে নিয়ে চলতে ইচ্ছে করে না। যেমন এই মুহূর্তে এই জলাশয় আমার কাছে রূপকথার গল্পের মতো সুন্দর কোনো সরোবর- যেখানে চাইলে অনায়াসে ফুটে উঠবে নীল পদ্ম তবে শুধু বিশেষ কারোর ইশারায়।
লবণ সমুদ্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে চললাম ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের একটি গ্রামে যার নাম ‘সোদরান’। লবণের লীলাভূমি শেষ হতেই আবার শুরু হলো লাল মৃত্তিকার সমতলভূমি। এ যেন লাল মেঠো মরুপ্রান্তর, লাল রং যেখানে শুষে নিয়েছে খোদ সূর্যকেও। শীতকাল বলে গরমের লেশমাত্র নেই। আর এই বিরান অঞ্চলে, খাঁখাঁ চারদিকে মাঝে পাকা রাস্তা আর কয়েক মাইল পর পর যখন একটি কাঁটা ঝোপ অস্তিত্বের জানান দিয়ে যায় তখন একই পথে কোনো রাখাল কিশোরের দেখা মেলা যেন ঈশ্বরপ্রদত্ত বর। রাখালের গায়ে পাকিস্তানি কাবলি কুর্তা সালওয়ার, কাঁধে লাঠি বহু বহু দূরে বিন্দুসম তার মহিষ কাঁটাঝোপ থেকে পাতা খাচ্ছে বা চড়ে বেড়াচ্ছে৷ এই অপার শূন্যদ্যানে একমাত্র বাসিন্দা সে।
কয়েক মাইল দূরে আরো এক প্রাণীর দেখা মিলল, তিনি এক মাঝবয়সী মানব, হেঁটে গ্রামের পথে চলছেন। এই দুর্গম, শূন্য জগতে কে জানে কত দূরে তার গ্রাম। হয়তোবা পৌঁছানোর জন্য কোনো যানবাহনও নেই। খুব অবাক করে মাঝে মাঝে সবজি খেত উঁকি দেয়, তাও অপ্রতুল। চোখে সবুজের আভা লাগতেই যেন মিলিয়ে যায়। বড়োই কঞ্জুস প্রকৃতি।
পথিমধ্যে একটি পাতার ছাদ আর লাঠির খুঁটি দেওয়া ছাউনি। পথিকের একমাত্র ভরসা। এ গ্রামে ভ্রমণার্থী কেউ আসে না। আহমেদাবাদ, গান্ধীনগর থেকেও কেউ আসে না। বিখ্যাত নয় কোনো কিছুর জন্যই। এই প্রান্তরে পা রাখার আগেই মোবাইল নেটওয়ার্ক উধাও হয়ে গিয়েছে। এমনটা হবে জানা ছিল। ভারত-পাকিস্তান কোনো সীমান্তে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। এতে আমার তেমন কোনো অসুবিধে হয়নি কোথাও। আর সাথে স্থানীয় ড্রাইভার ইসমাইল ভাই তো আছেনই।
সোদরানা গ্রামটি বেশ আধুনিক। পাকা ঘর, টালির ছাদ বা পাকা ছাদ। কোনো কোনো ঘর আবার দোতলা।

ফাতিমা ও সাকিনা, সোদরাণা গ্রামের কিশোরী
গ্রামের প্রাণ হাজি পির সাহেবের দরগাহ। সাদা দেয়াল আর সবুজ গম্বুজ যে চিরন্তন দরগাহ ভবনের কাসিদা গায়। দেয়ালের গায়ে আঁকা ফুল, পাতার নকশা। বলা হয়ে থাকে প্রায় তিনশ' বছর আগে হাজি পির নামক একজন দরবেশ এ গ্রামে আসেন। তার আবাসস্থল, বংশ, অতীত সম্পর্কে কারোরই কিছু জানা নেই। তিনি মক্কা থেকে হজ করে এ গ্রামে এসে থিতু হয়েছিলেন। অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই পির সাহেব নাকি রোগবালাই নিমেষেই সারিয়ে তুলতে পারতেন। মৃত্যুর পর হাজি পির সাহেবকে এ গ্রামেই সমাহিত করা হয়। গ্রামবাসী আজো তাকে স্মরণ করে, তার কবর জিয়ারত করে, সংকটকালে তার কাছে ছুটে আসে। অনেক দরগার ভেতরে নারী প্রবেশ নিষেধ। হাজি পির সাহেবের কাছে যেতে মানা নেই। প্রবেশদ্বার পার হয়ে অনেকখানি আঙিনা, তারপর প্রথম গৃহে শুয়ে আছেন খোদ হাজি পির সাহেব। সবুজ মখমল এখন তার রাত-দিনের সাথী আর তার ওপর ভক্তদের ভালোবাসার চাদর লাল গোলাপ। আরো খানিক দূরে পর পর কয়েকটি কবর হাজি পির সাহেবের ভক্তদের। গ্রামখানিকে সমৃদ্ধ মনে হলেও দরগায় ভিক্ষে করতে আসা লোকও আছে, তবে সংখ্যায় হাতে গোনা। দরগার ভেতরে নারী-পুরুষ নিজেদের মতো করে উপাসনায় ব্যস্ত। হাজি পির সাহেবের কাছে সব বলা চাই, সব রোগের দাওয়া এবং দোয়া চাই। আশপাশের গ্রাম থেকেও আসেন অনেকে জাত-ধর্মের বেড়াজাল ডিঙিয়ে। দরগার বাইরে গ্রামের কিশোরীরা নৈবেদ্য নিয়ে বসেছে, দর্শনার্থীরা কেনেন, থালি ভরে কিছু গোলাপ ফুল, আগরবাতি, সামান্য মিছরি। দুর্গম গ্রামে এর চেয়ে বেশি আর কী বা পাওয়া যায় পির সাহেবকে নজরানা দেবার মতো! গ্রামের একজন মিষ্টি কিশোরী বসে ছিল ফুল, আগরবাতি নিয়ে। উদাস দৃষ্টি, কোথায় যেন হারিয়ে যেতে চায়, মুখে সাবলীল হাসি, হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে। কাছে গিয়ে বললাম, ‘কী নাম গো তোমার?’
‘ফাতিমা’।
‘আরে, আমার নামও ফাতিমা। তোমার বাড়ি কি কাছেই? কে কে আছে বাড়িতে? ফুল বেচো কেন, স্কুলে যাও না? মা-বাবা কী করেন?
এত প্রশ্নে ফাতিমা দিশেহারা। এই গ্রামেরই মেয়ে, বাড়ি খানিকটা এগোলেই, দুই ভাই এক বোন আছে। বাবা কৃষক। এই গ্রামে একটাই স্কুল, সেখানে ও পড়েছে গত বছর অবধি, ষষ্ঠ শ্রেণির পর আর পড়া হয়নি। ভাই-বোনেরা ছোট, তারা স্কুলে যায়। নীল কামিজ আর নীল ওড়নায় ফাতিমাকে নীল পরি লাগছিল। ফাতিমার পাশে একই বয়সী সাকিনা বসে ছিল। সেও নৈবেদ্য সাজায়, বিক্রি করে। দেখতে গোলাপে মোড়া অপ্সরী। এ গ্রামের সব কিশোরীর গল্প প্রায় একই। ততক্ষণে ফাতিমা, সাকিনার দেওয়া গোলাপ ফুলে আমার ঝোলা ভরে গিয়েছে আর মন ভরে গিয়েছে ভালোবাসায়।
পর্ব ২
লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]
ইত্তেফাক/আরএ
