সাটুরিয়ার তাঁতীদের দুর্দিন

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৯, ২৩:৪৩

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প দিনদিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যারা কোনো রকমে টিকে আছেন তারা জানিয়েছেন, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও ভারতীয় শাড়ির আমদানি বন্ধ না হওয়ায় এ শিল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক তাঁতী তাদের পেশা পরিবর্তন করেছে।

উপজেলার সাভার গ্রামের তাঁতপল্লির তাঁতী মোঃ আলমগীর হোসেন ও আব্দুস সালাম শফিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাগো এহন আর শাড়িতে ভাত অয় না। কষ্ট বেশি আয় কম। যে কারণে মানুষ এহন অন্য কাম করে। ১৯৯৮ সাল থেকে তারা শাড়ি বুনেন। আগে শাড়ির খুব কদর ছিল। দামও ভালো পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন তা পাওয়া যায় না। তারা বলেন, একদিনে ২-৩টি শাড়ি বুনা যায়। তাতে যে কষ্ট হয় সে অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না। কিন্তু এই সময় অন্য কাজ করলে বেশি মজুরি পাওয়া যায়।  কলমাইদ গ্রামের তাঁতী মোঃ ওমর ফারুক বলেন, সাটুরিয়ার বিভিন্ন গ্রাম নিয়ে একসময় তাঁতপল্লি গড়ে উঠেছিল। রঙ, নকশা ও বৈচিত্র্যে এখানকার শাড়ির সুনাম রয়েছে সারা দেশে। অন্য এলাকার চেয়ে এখানকার শাড়ির জমিন আর পাড়ের রঙ ও নকশার মধ্যে বৈশিষ্ট্য আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় তাঁতীরা নিরুত্সাহিত হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

উপজেলার সাভার, আগসাভার, হামজা, জালশুকা, চাচিতারা গ্রামে একসময় ঢুকলেই কানে ভেসে আসতো তাঁতের ঠক ঠক শব্দ। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ছিল তাঁত। হাজারও তাঁতী সুনিপুণ হাতে তৈরি করতেন শাড়ি। কিন্তু এখন মাত্র সাভার ও চাচিতারা গ্রামের ৫০টি পরিবার শাড়ি তৈরি করেন। টাঙ্গাইলের করটিয়া, পাথরাইল ও মানিকগঞ্জের শাকরাইল এলাকার মহাজনের নিকট শাড়ি বিক্রি করা হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার পেলে শাড়ি তৈরি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ শিল্পে টিকে থাকা তাঁতীরা জানান, এ শিল্পের ঐতিহ্য ও সুনাম এখনও রয়েছে, তবে হারিয়ে গেছে জৌলুস। কাঁচামাল ও উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি আর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। বন্ধ হয়েছে এলাকার ৯০ ভাগ তাঁত। শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তা চান তারা।

বরাইদ ইউনিয়নের তাঁত শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ দাউদ হাসান লাভলু জানান, ব্রিটিশ আমলে এই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে হস্তচালিত তাঁতশিল্প গড়ে ওঠে। তাঁতে তৈরি করা হতো বিভিন্ন রঙ ও সাইজের আকর্ষণীয় শাড়ি, গামছা ও লুঙ্গি। বংশগত ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আমরা এখনো এ পেশায় আছি। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আমরা মহাজনের নিকট জিম্মি। দ্রুত সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। বরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ হারুন-অর-রশিদ জানান, সাটুরিয়ার তাঁতীদের তৈরি করা শাড়ির কদর সারা দেশেই রয়েছে। এ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে তাঁতীদের সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে।