২০১৪ সাল চলছিল তখন; সুইডেনের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রোম বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেছিলেন, সুইডিশ সরকার নারীবাদী বিদেশনীতি গ্রহণ করতে পারে এবং এ বিষয়ে তারা হতে যাচ্ছে পৃথিবীর প্রথম জাতি। তখন থেকে এমন অভীষ্ট লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে কানাডা, ফ্রান্স ও মেক্সিকোসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র। অতিসম্প্রতি অনুরূপ নীতির বিকাশ ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে লুক্সেমবার্গ, মালয়েশিয়া ও ফ্রান্স। উল্লিখিত প্রত্যেকটি দেশের এমন ঘোষণায় বৈদেশিক নীতি বিশেষজ্ঞদের মনে অনেক প্রশ্নের উদয় ঘটেছে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে—আসলে কী অর্জনের লক্ষ্যে এসব নীতির জন্ম? বৈশ্বিক কার্যক্রমে সমতা বৃদ্ধির চলমান সময়ে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিদেশনীতি পরিচালনার প্রকৃত অর্থটা কি? তাদের অভিমত, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এ যুগে লিঙ্গ সমতার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উন্মত্ততা ছাড়া কিছুই নয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে যে, নারীর অবস্থান একটা দেশের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। এ প্রেক্ষিতে বিদেশনীতির অগ্রাধিকার হিসেবে লিঙ্গসমতার উন্নয়ন ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির বিষয়টা শুধু সাধারণ জ্ঞানের ব্যাপার। শ্রমশক্তির অংশগ্রহণে লিঙ্গব্যবধান কমিয়ে আনতে পারলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিবছর যুক্ত হতে পারে ২৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। শান্তি প্রক্রিয়ার আলোচনার মেয়েদের সক্রিয় অংশগ্রহণে চুক্তি বাস্তবায়ন ও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একটা দেশের সংসদে নারীদের উপস্থিতি যত বেশি থাকবে, ততই কমবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ও সহিংসতা। কৃষিজ সম্পদে নারীর সমঅধিকার থাকলে এ ধরায় কমে যাবে ১৫০ মিলিয়ন ক্ষুধার্ত লোকের সংখ্যা।
সুনির্দিষ্ট তারিখ নেই; দিবসটিও প্রতীকী। যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা প্রতিবছর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ কোনো একটি দিনকে উত্সর্গ করে মজুরি সংক্রান্ত লিঙ্গবৈষম্য দূর করার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয় জেনেও প্রতীকীভাবে এদিন উপস্থাপন করা হয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষরা যে পরিমাণ আয় করেছে, ঠিক সেই পরিমাণ আয় করার জন্যে নারীদের আরো কত বেশি পরিশ্রম করতে হবে? আর এ দিনটি পরিচিতি পায় ইকুয়্যাল পে ডে হিসেবে। ফুল টাইম চাকরিতে নিযুক্ত মার্কিন নারীরা তাদের পুরুষ সতীর্থদের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম আয় করে। অর্থাত্ পুরুষদের ১ ডলারের বিপরীতে তাদের ভাগ্যে জুটে ৮০.৫ সেন্ট। আফ্রো- আমেরিকান ও হিস্পানিক নারীদের মধ্যে এই লিঙ্গগত মজুরিবৈষম্য সবচেয়ে বেশি। শেতাঙ্গ নন-হিস্পানিক পুরুষদের বিপরীতে তাদের আয় যথাক্রমে ৬১ ও ৫৩ শতাংশ। সার্বিকভাবে যদিও এই ব্যবধান কমে আসছে; কিন্তু তার গতি খুবই ধীর প্রকৃতির। বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা চলতি শতাব্দীতে মজুরির সমঅধিকারের স্বাদতো নিতেই পারবে না; উপরন্তু কখনো-ই নিতে পারবে কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে কখনো সমান মজুরি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, সেটি পাচ্ছি, পাচ্ছি করতে করতেই বাস্তবায়নের সালটা দাঁড়াবে ২১০৬। তার মানে চলমান শতাব্দীতে আরাধ্য লিঙ্গবৈষম্যহীন মজুরির দেখা মিলছে না।
সমান শ্রম, ঘাম, মেধা ও বুদ্ধি খাটালেও মজুরির ব্যাপারে লিঙ্গগত বৈষম্য শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই বিদ্যমান নয়, এর উপস্থিতি বিশ্ব জুড়ে। প্রকৃতপক্ষে ধরায় এমন কোনো দেশই নেই, যারা বুক ফুলিয়ে বলতে পারে যে, এ ব্যাপারে আমরা অন্তত ব্যতিক্রম। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুসারে, বিশ্বে নরের বিবেচনায় নারীর আয় গড়ে ৬৩ শতাংশ। জেন্ডার প্রশ্নে মজুরির অসমতা শুধুমাত্র নারীকেই তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না; গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের করা এক জরিপ থেকে উঠে এসেছে যে, মজুরিবৈষম্যসহ শ্রমশক্তিতে নারী ও পুরুষের মধ্যে কমতে থাকা নানা ব্যবধানের অবদানস্বরূপ ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত হতে পারে ২৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার সুফল ভোগ করতে পারে উন্নত এবং উন্নয়নশীল সব দেশই।
উদাহারণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতে যদি পুরুষদের মতো ও নারীরাও সমান কর্মঘণ্টা কাজ করে সমবেতন পায়, সমান হারে শ্রমশক্তিতে অংশ নেয় এবং সকল খাতের সর্বস্তরে নিযুক্ত হয় তাহলে বছরপ্রতি মোট দেশজ উত্পাদনে আরো যুক্ত হতে পারে যথাক্রমে ৪.৩, ৪.২ ও ২.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার সুফল ভোগ করতে পারে বিশ্বের নামিদামি সব কোম্পানিও। করপোরেট নেতৃত্বের অবস্থানে নারীর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব স্বভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানের নৈপুণ্যের উন্নতি ঘটাতে সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়। মজুরি দেওয়া বা নেওয়ার লিঙ্গগত বৈষম্য একেবারেই নির্মূল করতে চাইলে সবার আগে এর কারণগুলো বোঝাটা খুবই জরুরি।
— ডেইলি মিরর অনুসরণে
