সদ্য এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের চিরাচরিত হাসিমুখ আমরা এবার দেখতে পাইনি। করোনা গ্রাস করেছে সকল আনন্দ।
সারা দেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার ২৮ শিক্ষার্থী। পাশ করেছে মোট ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫২৩ জন। বাকি প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থীর অবস্থা একবার চিন্তা করুন তো! কী চলছে সেখানে? কী করছে তারা? কেউ ব্যর্থতার জ্বালা ও লজ্জা ঢাকতে ঘরের দরজা এঁটে অঝোরধারায় অশ্রুপাত করেছে, কেউ বাবা-মার তিরষ্কারে হতাশায় বাড়িছাড়া হয়েছে, কেউবা ভেবেছে—বেঁচে থেকে কী লাভ?
প্রত্যেক পরীক্ষার (বিশেষ করে স্কুলপর্যায়ে) ফল প্রকাশের পর সলিল বিশ্বাস অনূদিত ‘বারবিয়ানা স্কুল থেকে আপনাকে বলছি স্যার’ বইয়ের কথাগুলো আমার মনে ভীষণভাবে তোলপাড় করতে থাকে। বইটি মূলত একটা চিঠি। আমাদের এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরাও লিখে ফেলতে পারে ইতালির টামকানি প্রদেশের বারবিয়ানার ‘সর্বাত্মক স্কুল’-এর ছাত্রদের মতো বিশাল এক চিঠি। চিঠিটি শিক্ষকদের বিবেকের কফিন থেকে পেরেক তুলে আনার মতো বিষয়। ‘তোদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না’—বলে যে শিক্ষক স্কুল থেকে বেরিয়ে যাবার রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সেই ছাত্ররাই প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তাদের সমস্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছিল ‘আপনাকে বলছি স্যার’ বইটি।
‘প্রিয় স্যার’ সম্বোধনে তারা লিখছে—‘আপনাদের বাধ্যতামূলক স্কুল থেকে বছরে চার লক্ষ বাষট্টি হাজার ছাত্র খসে পড়ে। এর জন্য দায়ী কে? দায়ী আপনারা। এরা কোথায় গেল তা দেখতে তো যানই না আপনারা, এদের কথা ভেবেও দেখেন না।’
ইতালির মুজেল অঞ্চলের পার্বত্য এলাকা। গোটা কুড়ি খামার নিয়ে তৈরি একটি জনবসতি—নাম বারবিয়ানা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। কিন্তু এখানকার স্কুল ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি ছেলেদের চরম অনীহা। সেখানে ১৯৫৪ সালে পাদ্রী জন লরেনজো মিলানি একটি নতুন ধরনের স্কুল খুললেন। যার নাম ‘সর্বাত্মক স্কুল’। এখানে যারা পড়তে এলো তারা এক অর্থে প্রথাগত স্কুলখেদানো ছেলে। মিলানি শুরু করেন এদের নিয়েই। ফাদার মিলানী মারা যান ১৯৬৭ সালে। বারবিয়ানা স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর আদর্শ মরে না। একটি সমান্তরাল স্কুলের মডেল হয়ে থাকে বারবিয়ানা স্কুলটি। বারবিয়ানার আদর্শে অনুপ্রাণিত শিক্ষকেরা বিনা পারিশ্রমিকেই পঠনপাঠনে এখানে সাহায্য করেন।
এই আলোচিত সমস্যা আমাদের দেশেও খুব পরিচিত। যে বেদনাবোধ বারবিয়ানার স্বশিক্ষিত ছাত্রদের দৃঢ় সংকল্পে উদ্দীপ্ত করেছে, তার সঙ্গে যে কোনো স্পর্শকাতর মনই একাত্মবোধ করতে বাধ্য। আমাদের দেশে এমন ছাত্রের অভাব নেই যাদের কাছে এ বই নতুন এক দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
এ এক অন্যরকম স্কুল। ‘শিক্ষক নেই, ডেক্স নেই, ব্লাকবোর্ড নেই, কতগুলো বড়ো বড়ো টেবিল কেবল। তার উপরেই খাওয়া। প্রত্যেটা বইয়ের একটা করে কপি। ছেলেরা হুমড়ি খেয়ে সকলে মিলে পড়ছে সেগুলো। বোঝাই যায় না, সেই ছেলের দলেই একজন যে বয়সে একটু বড়ো, পড়াচ্ছে সেই।’ তারা শিখছে একসঙ্গে। দার্শনিক সক্রেটিস পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাকে ধাত্রীর সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ধাত্রী যেমন গর্ভবতী মাকে সন্তান প্রসব করতে সহায়তা করেন ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষক পঠনপাঠনে সহায়তা করে।
সুখদুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-হতাশা নিয়েই জীবন। একে মোকাবিলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এগিয়ে নিতে হবে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশকে।
শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস, টাঙ্গাইল
