চীনা ফোবিয়ায় ভর করে নির্বাচনে জিততে চান ট্রাম্প !

আপডেট : ১৩ জুন ২০২০, ২২:০৪

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

বিশ্বের প্রায় ২১৩টি দেশ ও অঞ্চল কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে ধুঁকছে। দেশি বা আন্তর্জাতিক নিউজ ওয়েবাইট বা পত্রিকা খুললেই মানুষের অসহায় মৃত্যুর খবর। সারাবিশ্ব করোনা মহামারির ফলে ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য খাত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করছে। নিউজিল্যান্ডের মতো বেশ কিছু দেশ ভাইরাস সংক্রমণরোধে সফলতা দেখালেও ব্রাজিল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ চরম রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা দেখিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত ২ মিলিয়ন লোক আক্রান্ত ও ১ লাখ ১২ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে যা একক দেশ হিসেবে বিশ্বে সর্বোচ্চ। বর্তমানে মার্কিন অর্থনীতি শতকের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। এপ্রিল মাসেই মার্কিন শ্রম বিভাগ জানায়, করোনা মহামারির কারণে দেশটিতে ৬.৬ মিলিয়ন মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে যা বর্তমানে ১৩ মিলিয়নে পৌঁছেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়াকে দায়ী করছেন বিরোধী শিবির। এদিকে মহামারি সত্ত্বেও আগামী নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যে কোভিড-১৯ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে সে কোভিড-১৯ কে নির্বাচনি প্রচারণার অংশ করছেন ট্রাম্প। মার্কিন এই ৪৫তম প্রেসিডেন্ট তার ঘরোয়া রাজনীতির জন্য বারবারই উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়েছেন নিজ দেশ ও বিশ্ব জুড়ে। কাতার অবরোধ, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বাতিল করা, একচেটিয়াভাবে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া তার সে উগ্রপন্থি আচরণের বহির্প্রকাশ। সারা বিশ্ব যখন মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে একযোগে কাজ করছে তখন তিনি করোনা ভাইরাসকে ‘চীনের ষড়যন্ত্র’ প্রমাণে মরিয়া।

 মি. ট্রাম্প কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার জন্য চীনকে দায়ী করে করোনা ভাইরাসকে বলছেন ‘চীনা ভাইরাস’। এই নামের মেডিক্যাল ভিত্তি না থাকলেও এটার একটা রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে তা হলো—চীনোফোবিয়াকে উসকে দেওয়া। এক সময় মার্কিন নির্বাচন, সমরাঙ্গন, হলিউডের সিনেমা সব জায়গায় বড়ো উপাদান ছিল রুশো ফোবিয়া। মি. ট্রাম্প রুশো ফোবিয়ার জায়গায় চীনা ফোবিয়াকে স্থলাভিষিক্ত করে নির্বাচনে জেতার পরিকল্পনা করছেন। নিজের ব্যর্থতা দায় চীনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নির্বাচনে চীনবিরোধী কার্ড ব্যবহার করছেন।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’কে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস চীনের তৈরি নয় বরং প্রাকৃতিক বলে বিবৃতি দেয়। এতে ক্ষেপে গিয়ে ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চীনা সংস্থা অভিযোগ করে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। গত মাসে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৭৩তম অধিবেশনে কোভিড-১৯ নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্মত হলেও সাড়া দেয়নি আমেরিকা। বরং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাত জাতি ভার্চুয়াল আলাপের উদ্যোগ নেন। যেখানে যোগ দেওয়া দেশ অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইসরাইল, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত চীনবিরোধী ও মার্কিন অনুগত।

২০১৮ সালে চীন বাণিজ্য যুদ্ধে বেশ কিছু মার্কিন কোম্পানি এবং বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আরো শ খানেক মার্কিন কোম্পানি চীন ছাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। জাপান সরকার জাপানি কোম্পানিকে চীন ছাড়াতে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। সমসাময়িক সময়ে মোদি সরকার তার দেশে চীনা বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ জারি করেছেন। এসব উদ্যোগ স্পষ্ট বার্তা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে বিশ্বে চীনবিরোধী স্পষ্ট ব্লক তৈরির চেষ্টা চলছে।

এই ব্লক তৈরি ও চীনা ফোবিয়া তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়-পরাজয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে দুই তৃতীয়াংশ আমেরিকান চীনকে নেতিবাচকভাবে দেখে। মি. ট্রাম্প টুইটে প্রচার করছেন,‘ চীন বিপুল ভুল তথ্য দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। কারণ তারা চায় ঘুমন্ত জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হউক। যাতে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে।’ ডেমোক্রেটিক শিবিরের পদপ্রার্থী জো বাইডেন টুইটে ট্রাম্পের ব্যর্থতা, দেশ জুড়ে বেকারত্ব, দেশকে পিছিয়ে দেওয়া নিয়ে যখন সমালোচনামুখর তখন তার জবাবে ট্রাম্প বাইডেনকে চীনপন্থি প্রমাণে ব্যস্ত। তার লক্ষ্য একটাই চীন বিরোধিতা ও চীনা ফোবিয়াতে ভর করে কট্টর জাতীয়তাবাদী ভোটে ফের প্রেসিডেন্ট হওয়া। কিন্তু মার্কিনিরা এই প্রথম দেখেছে ডলারের বিনিময়ে মানুষ বাঁচতে পারেনি। লাখ লাখ মার্কিনি চাকরি হারিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতেও দুর্বল হয়ে পড়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ফলে শুধু চীনা ভাইরাস তত্ত্ব ও চীনা ফোবিয়া দিয়ে নির্বাচনে জিতে আসা কঠিন। তবে করোনা মহামারি বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নেতৃত্বের যে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সে পরিবর্তনের এপিঠ-ওপিঠের সমীকরণ অনেকাংশে নির্ভর করছে হোয়াইট হাউজের মসনদে পরবর্তী বছরে কে বসছেন তার ওপর।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়